ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 16


ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 16

রানি লক্ষ্মীবাইয়ের দেহ যখন প্রাণহীন হয়ে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই একটুও দেরি না করে ব্রিটিশ সৈনিকের ছদ্মবেশে ও ঐ ভঙ্গিতে থাকা সরদার মঞ্জুনাথ পাহাড়ি রানি লক্ষ্মীবাইয়ের নিথর দেহটি তুলে নিজের ঘোড়ার উপর স্থাপন করলেন। উচ্চস্বরে চিৎকার করতে করতে তিনি বলতে লাগলেন, 
“এই মৃতদেহটি মেজর হিউ রোজকে দেখানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি!”
এই কথা বলতে বলতে এবং সবাইকে দেখিয়ে  সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘন বৃক্ষরাজিতে আচ্ছাদিত একটি অংশের ভেতরে প্রবেশ করলেন, চোখের পলকে সকলের দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেলেন।
ব্রিটিশদের ছাউনিটি ছিল জঙ্গলের মধ্যেই। আগে এমন কোনো পরিকল্পনা স্থির হয়নি, আর সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ি যে এমন এক দুঃসাহসিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন—তা দেখে রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সঙ্গে থাকা মুন্দর বেগম, মোতিবাই, রাজকুঁয়ার ও রামচন্দ্ররাও সমান তৎপরতায় জঙ্গলের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত দিয়ে তাঁর পিছু নিলেন। এই জঙ্গলাঞ্চলটি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘খুনের উপত্যকা’ নামেই পরিচিত ছিল। গভীরভাবে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, এই এলাকায় ভূত-প্রেতের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। সেই কারণেই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় বংশোদ্ভূত সৈনিকেরা এই অঞ্চলের গাছ কাটতে অস্বীকার করেছিল। ফলে, সেই ব্রিটিশ সৈনিকের—অর্থাৎ সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ির—পেছনে একজন ভারতীয় সৈনিকও দৌড়ায়নি। এমনকি যারা দশ–কুড়ি জন ব্রিটিশ সৈনিক তাঁকে অনুসরণ করতে উদ্যত হয়েছিল, তাদেরও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈনিকরাই বাধা দিয়ে থামিয়ে রেখেছিল।
রানির শেষকৃত্য সম্পন্ন হতেই মুন্দর বেগম সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি এই ‘খুনের উপত্যকা’ আগেই দেখে রেখেছিলেন? আপনার মাথায় এমন ভাবনা কীভাবে এল?”
জঙ্গল পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে আসতেই সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ি উত্তর দিলেন,
“এই উপত্যকার সব দিক সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখার নির্দেশ আমাকে স্বয়ং রানি লক্ষ্মীবাই সাহিবা দিয়েছিলেন। গোয়ালিয়রে পৌঁছানোর পর প্রথম রাতেই তিনি আমাকে এই আদেশ দেন। কারণ, যদিও আমি ঝাঁসির বাসিন্দা, তবু গোয়ালিয়রের এই অঞ্চলটি আমার নানার বাড়ি অর্থাৎ মায়ের বাপের বাড়ি।
আমি একবার সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আসার পর, রানি লক্ষ্মীবাইয়েরই নির্দেশে আমাদের গুপ্তচর বিভাগের প্রধান এক গুপ্তচর, ‘সাধু ভগবানদাস’ গত চৌদ্দ দিন ধরে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ব্রিটিশ সৈনিকদের মধ্যে এই স্থান নিয়ে নানান গুজব ছড়িয়ে দেন। তার ফলেই এই উপত্যকা থেকে বহু দূর পর্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ সেনারা আর প্রবেশ করার সাহস করত না। 
সেই সাধু ভগবানদাসই আজ রানি সাহিবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার ঠিক আগের মুহূর্তে। তাঁরই দেখানো পথে ও পরামর্শ অনুযায়ী রানি লক্ষ্মীবাই ব্রিটিশদের ছাউনিতে প্রবেশের গোপন পথ নির্ধারণ করেছিলেন।
মনে হচ্ছে যেন রানি সাহেবা নিজের মৃত্যু নিজেই নির্ধারিত করেছিলেন এবং নিজের অন্তিম সংস্কারের ব্যবস্থাও নিজেই করে রেখেছিলেন।”
মুন্দর বেগমের মুখ থেকে প্রথমবারের মতো হঠাৎ বেরিয়ে আসা চাপা কান্নার শব্দে তাঁর সঙ্গে থাকা সবাই চমকে উঠে তাঁর দিকে তাকাল। সে মুহূর্তটি কান্নাকাটি করার সময় মোটেই ছিল না, তাই প্রত্যেকেই মুন্দর বেগমকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের বিশেষ অঙ্গরক্ষিকা, সেই সাহসিনী মুন্দর বেগম এক মুহূর্তের মধ্যেই অশ্রু সংবরণ করে বললেন,
“ওই সাধু ভগবানদাসই ছিলেন রানি সাহিবার পিতৃদেব। তাই আমাদের তাঁর শেষকৃত্যের প্রস্তুতিও নিতে হবে।
এই কথাগুলো কানে যেতেই সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সর্দার মঞ্জুনাথ পাহাড়ি নমস্কার জানিয়ে বললেন, “পিতার মৃত্যু নিজের চোখের সামনে ঘটার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই রানি সাহিবা বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের কাউকেই কিছু আঁচ পেতে দেননি। রানি সাহিবা যেমন মহান, তেমনই তাঁকে জন্মদাতা পিতা শ্রী মোড়োপন্ত তাম্বেও ছিলেন একজন মহান ব্যক্তি।
মোরোপন্তই অর্থাৎ ভগবানদাসই আমাকে রানি সাহিবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার আগেই বলে রেখেছিলেন যে, ‘খুনের উপত্যকা’-য় অবস্থিত ভাঙাচোরা মন্দিরটির পেছনে শেষকৃত্যের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রী রাখা আছে।
ধন্য সেই পিতা, আর অতি ধন্য তাঁর কন্যা! নিজের নিজের শেষকৃত্যের সমস্ত প্রস্তুতি সেরে রেখেই তাঁরা দু’জনেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন। কিন্তু এখন মোরোপন্তজীর কী হবে? আমরা দুর্গে যাব কীভাবে? দুর্গের দিকে তো নানা পথ ধরে শত শত ব্রিটিশ সৈন্য ঢুকে পড়ছে।”
ঠিক সেই সময় ডান দিকের একটি ছোট টিলার ওপর থেকে এক বৃদ্ধ আদিবাসীকে দেখা গেল, পিঠে কাঠের গাঁটরি বাঁধা এবং সে ধীরে ধীরে নেমে আসছে। তার দিকে কোনো ব্রিটিশ সৈনিকের নজর পড়ারই কথা নয়। কারণ তারা এসেছিল লুটপাট করতে, আর সেই দরিদ্র বৃদ্ধ আদিবাসী কিংবা তার কাঁধে বহন করা কাঠের বোঝার মধ্যে কারোরই সামান্যতম আগ্রহ ছিল না।
আমাদের দলের লোকজনের দৃষ্টিও তার দিকেই আকৃষ্ট হয়েছিল—কারণ সেই বৃদ্ধ লোকটিই হঠাৎ করে একটি বড়সড় পাথর গড়িয়ে নিচের দিকে ছেড়ে দিয়েছিল।
সবাই নিজের নিজের অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মোতিবাই সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “ইনি সর্দার লালাভাউ বক্সী। (তথ্যসূত্র: কথামঞ্জিরী ৪-৩-১০) আমাকে জানিয়েই তিনি পেছনে রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মাথায় থাকা ময়ূরের পালকের টুপিটাই আমাদের জন্য নির্ধারিত পরিচয়চিহ্ন ছিল।”
মাত্র পাঁচ–দশ মিনিটের মধ্যেই লালাভাউ বক্সী পিঠে কাঠের গাঁটরির বড় বোঝা নিয়ে তাঁদের কাছে এসে পৌঁছলেন। আর সেই কাঠের গাঁটরির স্তূপের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মোরোপন্তজীর পার্থিব দেহ।
তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য সেই কাঠের গাঁটরিগুলোকেই ব্যবহার করা হয়েছিল। আর মুন্দর বেগম নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দেওয়া রানি লক্ষ্মীবাইয়ের গায়ের শালটি মোরোপন্তজীর পার্থিব দেহের উপর বিছিয়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর অগ্নিসংস্কারের সময় রামচন্দ্ররাও গভীর বেদনার সঙ্গে বললেন, “এই দু’জনের চরণে অর্পণ করার জন্য আমাদের কাছে একটি ফুলও ছিল না, এমনকি সাদামাটা তুলসীপাতাও না। আমার কাছে কেবল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মুখস্থ আছে—এইটুকুই সম্বল।”
মোতিবাই গম্ভীর স্বরে বললেন,
“ওঁদের দু’জনের মুখেই তুলসীপাতা স্বয়ং ভগবান নিজেই রেখেছেন, আর ফুল বর্ষণ করেছেন মা জগদম্বাই।”
রাজকুঁয়ার! তবে তুমি নিজেকে নিরাপদে রেখো এবং তোমার ভাই বিহারীলালের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হও। তোমাদের দু’জনের উপরই রানি লক্ষ্মীবাই ‘এই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার’ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। রানি লক্ষ্মীবাইয়ের কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ থাকা উচিত নয়। 
“আর থাকবেও না!”—এই কথাগুলোই ছিল লালাভাউয়ের পথ ধরেই পাহাড় থেকে নেমে আসা কমলাকুমারী চৌহানের। তিনি রাজপুত্র দামোদররাওকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে ফিরেছিলেন।
সেখানে সকলের কাছেই মোতিবাইয়ের নেতৃত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। কারণ স্বয়ং রানি লক্ষ্মীবাই তাঁকেই প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। সঙ্গে থাকা সকলকে নিয়ে মোতীবাই উপত্যকার গভীর খাদে নেমে পড়লেন। তাঁকে ধরলে মোট ষোলোজন পুরুষ এবং তিনি নিজে কমলাকুমারী, রাজকুঁয়ার ও মুন্দর বেগম, এই চারজন নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
মোতীবাই সকলের সঙ্গে ভালোভাবে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন, “সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক সর্দার দুলহেরাওকে হত্যা করতেই হবে, আর তার আগে তাকে উচিত শিক্ষা দিয়েই; আর তার পর রানি লক্ষ্মীবাইয়ের পিঠে ছুরি বসানো ব্রিগেডিয়ার স্মিথকে তো তিল তিল করে কষ্ট দিয়ে মারতে হবে।
দুলহেরাওয়ের হত্যার মাধ্যমে ভারতের বিশ্বাসঘাতকদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে হবে, আর ব্রিগেডিয়ার স্মিথের হত্যার মাধ্যমে ব্রিটিশদের মনেও ভয় ঢুকিয়ে দিতে হবে।”
বয়সে প্রবীণ সরদার লালাভাউ বক্সী বললেন,
“আর এই দুই হত্যাই শত শত মানুষের চোখের সামনে ঘটতে হবে। তবে সেই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে গিয়ে আমাদের প্রত্যেককেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
এরপর লালাভাউ বক্সী সবাইকে শপথবাক্য উচ্চারণ করতে বললেন, “দুলহেরাও ও ব্রিগেডিয়ার স্মিথের হত্যাই রানি লক্ষ্মীবাই এবং আমাদের আরও অসংখ্য সহযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাদের প্রতি আমাদের প্রকৃত পুষ্পাঞ্জলি হবে। বীরদের পুষ্পাঞ্জলি রক্তেরই হওয়া উচিত।”
সেই দিনই প্রথমবার বজ্রনিনাদের মতো ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো, “জয় রানি লক্ষ্মীবাই! জয় ভারতমাতা!”
(কথা চলবে) 

Comments