ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 22

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 22

গত এগারো দিনের যাত্রাপথে মোতিবাইয়ের সঙ্গে নর্মদাবাই, ভাস্কর ভট্ট ও সুভদ্রাবাইয়ের স্নেহের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হয়ে উঠেছিল। কারণ, মোতিবাইয়ের জীবনের বহু সত্য ঘটনা, যেগুলি তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলেন ও নিজে সম্পন্ন করেছিলেন, সেসব বিষয়ে এই তিনজনেরই কিছু না কিছু জানা ছিল; আর আরও জানার কৌতূহলও তাদের প্রবল ছিল। সেই কারণেই চারজনের কথোপকথন অবিরাম চলতে থাকত। তবে এই চারজনই বৃদ্ধের ছদ্মবেশে বলদগাড়িতে করে ভ্রমণ করছিলেন। ভোর হওয়ার আগেই তারা কোনো নদী বা হ্রদের তীরে গিয়ে প্রাতঃকৃত্য (শৌচ, দাঁত মাজা, মুখ ধোয়া প্রভৃতি সকালের কাজ) ও স্নান সেরে নিতেন। কারণ, তারা যখন গ্রাম ছেড়ে বেরিয়েছিলেন, ঠিক তখনই কোম্পানি সরকারের পুলিশের একটি দল সেই গ্রামেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপস্থিত হয়েছিল। রানি লক্ষ্মীবাই এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্যেক ভারতীয়কে খুঁজে বের করে ফাঁসিতে ঝোলানোর দায়িত্বই তাদের ওপর অর্পিত ছিল।

গ্রামের যারা যারা রানি লক্ষ্মীবাই-এর সেনাবাহিনীতে যুদ্ধ করেছিল, তাদের প্রত্যেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে সেই দলে যোগ দিয়েছিল; আর তারাও বুন্দেলখণ্ডে বসবাসকারী মারাঠিদের পোশাকই পরেছিল।

কাশী বিশ্বনাথ মন্দির এর শিখর দর্শন করে সবাই গঙ্গার ঘাট এ গেলেন। স্নানাদি সেরে তারা নদীতীরে একটি গাছের ছায়ায় বসে পড়লেন। ভাস্কর ভট্ট কাশীতে অবস্থানরত এক ব্রাহ্মণ পুরোহিতের সাহায্য নিয়েছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ অত্যন্ত চতুর ছিল, আবার লোভীও ছিল। তার অর্থলোভ দেখেই ভাস্কর ভট্ট তাকে বেছে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি এ কথাও তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, পুরোহিতের নিজের কাছে অর্থ বলতে তেমন কিছুই নেই। ভাস্কর ভট্টের পক্ষ থেকে আগেভাগেই সুচারুভাবে প্রদান করা অর্থের কারণে সেই পুরোহিত তাদের যে কোনো ধরনের সাহায্য করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল।

আমাদের এই দলকে বিধিপূর্বক অস্থি-বিসর্জন সম্পন্ন করে দ্রুত কাশী ত্যাগ করতে হতো; কারণ রানি লক্ষ্মীবাই কাশীতে এসে গিয়েছিলেন, এই খবর ব্রিটিশদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল (সন্দর্ভ: কথামঞ্জরী ৪–৩–১৪)। সেই কারণে এক ব্রিটিশ আধিকারিকের নেতৃত্বে পুলিশ কাশীতেই শিবির স্থাপন করে অবস্থান করছিল।

সকাল এগারোটার মধ্যে কাশীবাই, সুন্দরবাই, লালাভাউ বক্সী ও মঞ্জুনাথ পাহাড়ীর অস্থি-বিসর্জন সম্পন্ন করা হলো। তার পর ভাস্কর ভট্ট নিজ হাতে তাঁর কাকা, মোরোপন্তজীর অস্থিও বিসর্জন করলেন। এরপর সকলে আবার সেই গাছতলাতেই ফিরে এলেন। দুপুরের আহার সেই পুরোহিতই এনে দিয়েছিল। দলের প্রত্যেকে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে নীরবে গাছের নীচে বসে ছিল। সবার মনেই নানা স্মৃতি জেগে উঠছিল। কিন্তু ‘এটি নিরাপত্তার দিক থেকে ঠিক হবে না’, এই কথা অনুধাবন করে সর্বদা সজাগ থাকা মোতিবাই সকলকে তৎক্ষণাৎ সতর্ক হতে এবং অন্যান্য যাত্রীদের মতো স্বাভাবিক আচরণ করতে বললেন। সঙ্গে আসা গ্রামের চারজন পুরুষ মুণ্ডনও করিয়েছিলেন, আর ঘাটে তখন যথেষ্ট ভিড় ছিল। তাই সহজে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি মনে হচ্ছিল না। তবু মোতিবাইয়ের কাছে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করাই অত্যাবশ্যক বলে মনে হচ্ছিল।

সন্ধ্যা নামার আগেই সমগ্র দলটি ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। কিন্তু মোতিবাই রইলেন একা—নিজের সংকল্প, নিজের কর্তব্য আর অদম্য সাহসকে সঙ্গী করে।

সন্ধ্যা নামার আগেই সমগ্র দলটি ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। একমাত্র মোতিবাই অর্থাৎ ‘চিমাবাই আচার্য’ নামে পরিচিত, মুণ্ডিতমস্তক এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণ বিধবা, অল্প কিছু সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে পিছনে রয়ে গেলেন। ওদের প্রস্থানের প্রায় দুই ঘণ্টা পর, সূর্যাস্তের সময়, মোতিবাই উচ্চস্বরে ক্রন্দন শুরু করলেন।

এর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চারপাশে কৌতূহলী লোকজনের বেশ ভিড় জমে গেল। সেই সকালে দেখা সেই ব্রাহ্মণ পাণ্ডাও তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল। মোতিবাই তাকে উদ্দেশ করে বিলাপ করতে করতে বলতে শুরু করলেন, “আমার সব আত্মীয়রা কোথায় চলে গেল? তারা কি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে? তারা আমাকে ‘প্রসাদ’ বলে কিছু মিষ্টি খেতে দিয়েছিল, তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর থেকে গত দুই ঘণ্টা ধরে আমি তাদের খুঁজে চলেছি।”

কাশীর মানুষ এমন ঘটনার সঙ্গে বেশ পরিচিতই ছিল। অনেকেই নিজেদের বাড়ির বৃদ্ধ নারী-পুরুষদের কাশীতে মৃত্যুর জন্য ফেলে রেখে সেখান থেকে চলে যেত। আর এই পাণ্ডাকে তো ভাস্কর ভট্ট আগেই প্রচুর অর্থ দিয়ে রেখেছিলেন। এই কারণে সে নিঃসন্দেহ ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশে বলল, “এই বুড়িটা খুব ঝামেলা করে, এ কথা তার ছেলে বউমাই আমাকে বলেছে। বাড়ির কেউই তাকে চায় না। তারা আমাকে টাকা দিয়ে গেছে। তার খাওয়া-দাওয়া আর থাকার ব্যবস্থা আমি আমার বাড়ির বারান্দায় করে দেব; কারণ সে আমার দূরসম্পর্কের বোন হয়।”

মোতিবাই অসহায়তার ভান করে মাথায় নিজের গাঁটরি তুলে সেই পাণ্ডার বাড়ির বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লেন। সেই বারান্দা থেকে গঙ্গাজীর ঘাট এর একটি অংশ সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল।

রাতে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলে মোতিবাই এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে গাঁটরি এবং কাঁধে কাপড়ের ঝুলি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গাজির সামনের সেই ঘাটেই এসে পৌঁছালেন। স্থানটি ছিল সম্পূর্ণ নির্জন। 

মোতিবাইয়ের সঙ্গে থাকা গাঁটরির ভিতরে ছিল রানি লক্ষ্মীবাই-এর অস্থি, আর তাঁর রক্তে রঞ্জিত ফেটা (মহারাষ্ট্রে পরিধেয় ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি) । কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার দাবি রাখত যে বস্তুটি, তা ছিল, রানি লক্ষ্মীবাইয়ের তলোয়ার।

রানি লক্ষ্মীবাই এর অস্থি, তাঁর রক্তে রঞ্জিত ফেটা (মহারাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি) এবং তাঁর তরবারি, এই সবকিছুই তাঁর নিজের ইচ্ছানুসারে ব্রিটিশদের স্পর্শ থেকেও সম্পূর্ণ রক্ষা করে গঙ্গাজিতে বিসর্জন দেওয়া অপরিহার্য ছিল।

রানি লক্ষ্মীবাই কেবল একটিই শর্ত দিয়েছিলেন—‘ব্রিটিশদের স্পর্শ যেন না লাগে।’ কিন্তু মোতিবাই সেই পবিত্র স্মারকগুলো গঙ্গাজির পবিত্র জলে, তাও নিজের হাতেই, বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন।

রানি লক্ষ্মীবাই তাঁকে আপন সহোদরা বোনের মর্যাদা দিতেন, আর মোতিবাইয়ের প্রতিটি কথার ওপরই তাঁর ছিল অগাধ আস্থা।

এই কারণেই রানি লক্ষ্মীবাই এর সেই বীরাঙ্গনার অস্থি, তাঁর অস্ত্র ও ফেটা, এসব গঙ্গাজির জলে নিজের হাতেই বিসর্জন দেওয়াই ছিল মোতিবাইয়ের সর্বোচ্চ এবং একমাত্র ইচ্ছা। 

দিনদুপুরে সেই তরবারি বিসর্জন দেওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই ব্রিটিশদের হাতে পড়ে যেত। তাই মোতিবাই এই কাজের জন্য মধ্যরাত্রির সময়টিই বেছে নিয়েছিলেন।

কাঁধে ঝোলানো ঝোলায় রানি লক্ষ্মীবাই এর অস্থি, তরবারি ও ফেটা নিয়ে মোতিবাই ঘাটে এসে পৌঁছেছিলেন। ঘাটের প্রতিটি সিঁড়ি একে একে নামতে নামতে তাঁর মনে নানা স্মৃতি ক্রমশ ভেসে উঠছিল। কিন্তু আজ সেই স্মৃতিগুলো তাঁকে বিন্দুমাত্র দুঃখ দিচ্ছিল না। বরং এ কথা ভেবে মোতিবাই নিজেই বিস্মিত হচ্ছিলেন। অন্য সময় লক্ষ্মীবাইয়ের কথা মনে পড়লেই তাঁকে জোর করে নিজের অশ্রু সংবরণ করতে হতো।

কিন্তু আজ যেন সবকিছুই আলাদা ছিল। রানি লক্ষ্মীবাই এর প্রতিটি স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে মোতিবাই ঘাটের সিঁড়ি একে একে নেমে যাচ্ছিলেন। আর প্রতিটি সিঁড়ির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অন্তরে জন্ম নিচ্ছিল এক গভীর আনন্দের অনুভূতি, গর্বের দীপ্তি এবং পবিত্রতার এক অনির্বচনীয় স্পর্শ, যা ক্রমেই আরও প্রবল হয়ে উঠছিল।

অন্তিম সিঁড়িতে এসে মোতিবাই প্রথমে রানি লক্ষ্মীবাই এর অস্থি বিসর্জন দিলেন। এরপর তিনি তাঁর ফেটা জলে সমর্পণ করলেন।

তারপর মোতিবাই সেই ‘শেষ’ তরবারিটি দু’হাতে তুলে নিয়ে প্রথমে কপালে স্পর্শ করলেন। রানি লক্ষ্মীবাইয়ের অতি প্রিয় ও নিত্যজপের মন্ত্র, “ॐ নমো ভগবতে বাসুদেবায়”, তিনি উচ্চারণ করতে শুরু করলেন। ১০৮ বার জপ সম্পূর্ণ হওয়ার পরেই মোতিবাই সেই তরবারিটি গঙ্গাজিতে অর্পণ করার সংকল্প নিয়েছিলেন।

কিন্তু জপ যখন প্রায় ৮0 র কোঠায় পৌঁছেছে, ঠিক তখনই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এক পুলিশ অফিসার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মোতিবাইকে ধরার উদ্দেশ্যে তাঁর দিকে ছুটে এলো। তার সঙ্গেই থাকা এক ভারতীয় পুলিশ সিপাহিই মোতিবাইকে ঘাটে নামতে দেখে চিনে ফেলেছিল এবং খবর দিয়েছিল।

কারণ মোতিবাই কোনো বৃদ্ধ বিধবার ছদ্মবেশে ছিলেন না; তিনি ছিলেন ঝাঁসির সৈনিকের বেশে। বীরাঙ্গনার অস্থি ও তরবারিকে লুকিয়ে-চুরিয়ে বিসর্জন দেওয়া মোতিবাইয়ের মোটেই পছন্দ ছিল না।

সেই সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে মোতিবাইয়ের তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। বাম হাতে তিনি আঁকড়ে রেখেছিলেন রানি লক্ষ্মীবাই এর তরবারি, আর ডান হাতে নিজের তরবারি নিয়ে লড়াই চালাতে চালাতেই তিনি জপ সম্পূর্ণ করতে থাকলেন।

যেই মুহূর্তে জপ ১০৮ বার পূর্ণ হলো, ঠিক সেই ক্ষণেই মোতিবাই রানি লক্ষ্মীবাই এর তরবারি গঙ্গাজীতে অর্পণ করলেন। আর পরের মুহূর্তেই সৈনিকের বেশে থাকা সেই বীরাঙ্গনা মোতিবাই ব্রিটিশদের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে গঙ্গজীর বুকে লুটিয়ে পড়লেন। সকলের থেকে, সবকিছুর থেকে দূরে সরে গিয়ে, গঙ্গার পবিত্র স্রোতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর মুখে যে আনন্দ ও কৃতার্থতার দীপ্তি বিরাজ করছিল, ইতিহাসে তার তুলনা আর কিছুর সঙ্গেই হয় না।

(কথা চলবে)

Comments