ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 21

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 21

মোতিবাই এক বৃদ্ধা মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ বিধবার ছদ্মবেশে কাশীর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে যেতে দলের প্রত্যেকেই আগ্রহী ছিল। কিন্তু মোতিবাই দৃঢ়ভাবে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অন্য সকলের তাত্যা টোপের কাছে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত জরুরি। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে পুরো দলটি নীরবে বুন্দেলখণ্ডের এক পাহাড়ি গ্রামের মধ্যে আশ্রয় নেবে এবং ধীরে ধীরে সেখান থেকে নিজ নিজ স্থানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ ছিল।

মোতিবাইয়ের পিঠে একটি রেশমি পুঁটলিতে বাঁধা ছিল সেই ছয়জনের পবিত্র অস্থিভস্মভরা ছয়টি পবিত্র কলস। আর তাঁর কাঁধের ঝোলায় ছিল তাঁর পরিধানের বস্ত্র এবং জপ করার মালা। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজের সঙ্গে একটি অস্ত্রও নেননি; কারণ এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণ বিধবার কাছে যদি কোনো অস্ত্র দেখা যেত, তবে নানারকম সন্দেহের সৃষ্টি হতো এবং তাঁর কাজের পথে বাধা এসে দাঁড়াত। আর এই বিষয়টি মোতিবাই কোনোভাবেই চাননি।

 তিনি হাতে থাকা লাঠিকে ভর করে একাই সেই জঙ্গলের কাছাকাছি একটি গ্রামের ধর্মশালায় এসে পৌঁছালেন। তখন দুপুর বারোটা বেজে গেছে। গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করতেই তাঁর চোখের সামনে একটি রামমন্দির দেখা দিল। তিনি মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়েই গর্ভগৃহে বিরাজমান রাম-লক্ষ্মণ-জানকীর মূর্তিকে প্রণাম করলেন এবং দণ্ডবৎ প্রণামও করলেন। তারপর মনে মনে প্রার্থনা করলেন, “হে প্রভু রামভদ্র! এই পবিত্র অস্থিগুলি কাশীতে গিয়ে গঙ্গাজলে বিসর্জন দেওয়ার আমার এই সংকল্প সফল করুন। এঁদের কোনো মন্ত্রোচ্চারিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কাশীর গঙ্গার ঘাটে যদি অস্থি বিসর্জন করা হয়, তবে অন্য কোনো আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না।

“হে স্বয়ংভগবান রামভদ্র! আপনার তীর যেমন অমোঘ, তেমনি আপনার বরদানও অচ্যুত। আপনার নাম উচ্চারণ করেই হনুমানজি সেই বিশাল সমুদ্র পার করেছিলেন, তাঁর পক্ষে আর কী-ই বা অসম্ভব! আর আপনি তো ‘দীনদয়াল’ এই ব্রত ধারণ করে আছেন। আমার মতো একাকী নারীকেও আপনিই আশ্রয় দেবেন, এ আমার অটল বিশ্বাস।”

মোতিবাই পিঠে বাঁধা পুঁটলি আর কাঁধের ঝোলা নিয়ে মন্দিরের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল বটগাছের নিচে গিয়ে বসলেন।

গ্রামের কয়েকজন ব্রাহ্মণ পুরুষ তাঁকে মারাঠি ব্রাহ্মণ বিধবা বলে চিনতে পেরে নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন। 

সেখানে উপস্থিতদের মধ্যে রামমন্দিরের পুরোহিত ভাস্কর ভট্ট এবং তাঁর স্ত্রী নর্মদাবাই মূলত মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন। এই কারণে তাঁরা দু’জনেই মারাঠি ভাষায় ভালোভাবে পারদর্শী ছিলেন। নর্মদাবাই সহানুভূতির সঙ্গে মোতিবাইয়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “মৌসি! আপনি একাই এতগুলো অস্থিকলস নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন? আপনার সঙ্গে কোনো আপনজনও নেই। আপনার দুঃখ আমরা বুঝতে পারছি। কী ঘটেছে, তা কি আমাদের বলবেন? আমরা দু’জন নিশ্চয়ই আপনাকে সাহায্য করব। আমাদের গ্রামের অন্য লোকেরাও খুবই সৎ ও হৃদয়বান।”

মোতিবাই হিন্দুস্তানি ভাষাতেই উত্তর দিলেন,

“আমিও ঝাঁসিতেই থাকতাম। আমার আদি নিবাস পুনে। ব্রিটিশ ফৌজের ঝাঁসির ওপর আক্রমণে আমার ছয়জন আত্মীয় বিনা দোষে নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ। আমার পরিবারে এখন শুধু এক নাতিই বেঁচে আছে। তাকে আমার বোনের কাছে রেখে আমি কাশীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। আমরা গরিব ব্রাহ্মণ মানুষ, এত দূরের পথচলায় আমার সঙ্গে আর কে-ই বা আসবে?” ‘আমার বেঁচে থাকা নাতি’, এই কথাটি বলতে বলতে মোতিবাইয়ের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল রানি লক্ষ্মীবাই-এর দত্তকপুত্র দামোদর রাও এর মুখ।

মোতিবাই আরও বললেন, “সারা ঝাঁসি শহরে ব্রিটিশরা জায়গায় জায়গায় অগ্নিসংযোগ করেছিল, আর সেই অগ্নিকাণ্ডেই এ সব ঘটেছে। সেখান থেকে একের পর এক পথপাড়ি দিয়ে আমি এখানে এসে পৌঁছেছি। কেউ যদি কাশীযাত্রী হয়, তবে তার সঙ্গেই এগোব। আমার অশৌচ পর্বও শেষ হয়েছে, তাই স্পর্শ অস্পর্শের কোনো প্রশ্ন নেই। সঙ্গে অস্থিকলস আছে বলেই মন্দিরে প্রবেশ করিনি, এই পর্যন্তই। আজ রাতেও এখানেই থেকে বিশ্রাম নেব।”

মোতিবাইয়ের কথা শুনে উপস্থিত প্রত্যেকেই গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে উঠল। সেই গ্রামের অনেকেরই আত্মীয়-স্বজন ঝাঁসিতে বাস করতেন। মোতিবাই ইচ্ছাকৃতভাবেই কাতর ক্রন্দনে ভেঙে পড়লেন এবং অশ্রুপাত করতে লাগলেন। তখন তিন-চারজন মহিলা এগিয়ে এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, “আপনার সঙ্গে গ্রামের কেউ না কেউ অবশ্যই যাবে। কারণ আমরা প্রত্যেকেই ঝাঁসিতে আমাদের কারও না কারও আপনজনকে হারিয়েছি। আর রামমন্দিরের পুরোহিত ভাস্কর ভট্ট ও তাঁর স্ত্রী নর্মদাবাই তো হামলার সময় ঝাঁসিতেই ছিলেন, তাঁরাই আমাদের সমস্ত সংবাদ জানিয়েছেন। অন্য কেউ না গেলেও আমি একাই আপনার সঙ্গে যাব। কারণ আমার মায়ের বাড়ির সকলেই ঝাঁসির অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। আপনার সঙ্গে থাকা এই অস্থিগুলির বিসর্জনের সময় আমি আমার আত্মীয়দের নামেও গঙ্গামাইয়ার উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন করব।” সুভদ্রাবাইয়ের চোখ থেকেও তখন অবিরাম অশ্রুধারা বইতে লাগল। তিনি মোতিবাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি মোতিবাইকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের বাড়ির আপনজনদের হারানোর দুঃখ তাঁর অশ্রুধারায় প্রবলভাবে উথলে বেরিয়ে আসছিল।

মোতিবাইয়ের মনে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে এলো, অন্তত কেউ একজন তাঁর সঙ্গে যেতে পারে। কারণ তিনি নিশ্চিতই জানতেন, ব্রিটিশদের গুপ্তচররা নিশ্চয়ই তাঁকে খুঁজছে। তাঁর একাকী যাত্রা কোনো বিশ্বাসঘাতকের নজরে পড়ে যেতে পারত। তাঁকে ‘মোতিবাই’ হিসেবে চিনে ফেলা প্রায় অসম্ভব ছিল, কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা প্রতিটি অস্থিকলসে সেই ব্যক্তির একটি করে গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন সংরক্ষিত ছিল, আর সেই চিহ্নের মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

সুভদ্রাবাইয়ের পিঠে স্নেহভরে হাত বুলিয়ে নর্মদাবাই বললেন, “আপনি অবশ্যই এঁর সঙ্গে যাবেন। আমরাও গ্রামের চার-পাঁচজন লোককে অন্তত এঁর সঙ্গে পাঠাতে পারি।”

কথা বলতে বলতেই নর্মদাবাইয়ের চোখেও জল চলে এলো। মোতিবাই অনুভব করলেন, নর্মদাবাই ও ভাস্কর ভট্ট নিজেদের দুঃখ গোপন করার চেষ্টা করছেন। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, তাঁদের মনেও ঝাঁসিকে ঘিরে কোনো না কোনো বেদনা জমে আছে।

কিন্তু মোতিবাই নীরবই রইলেন। তিনি নিজের নাম ‘চিমাবাই আচার্য’ বলে জানিয়েছিলেন।

মন্দিরের ধর্মশালায় মোতিবাইয়ের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। রাতে তাঁর জন্য আহার নিয়ে নর্মদাবাই ও ভাস্কর ভট্ট দু’জনেই এলেন। তাঁরা বললেন, “গ্রামের দশ-বারোজন লোক আপনার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত হয়েছে; কারণ তাঁদের প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো আপনজন নিহত হয়েছে।”

মোতিবাই এক মুহূর্তের জন্য রামমন্দিরের শিখরের দিকে তাকালেন এবং মনে মনে প্রার্থনা করলেন, “হে দেবাদিদেব! এমন কাউকে আমার সঙ্গে পাঠাবেন না, যার উপস্থিতিতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে বা ব্রিটিশদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে।”

তিনি মনে মনে এই প্রার্থনাই করছিলেন, এমন সময় ধর্মশালার জানালা দিয়ে একটি কাঠবিড়ালি ভেতরে ঢুকে সরাসরি মোতিবাইয়ের পুঁটলির ওপর লাফিয়ে পড়ল এবং তার ভেতরে ঢুকে গেল।

তার এই দাপাদাপিতে যদি মাটির কলসগুলি ভেঙে যায়, এই আশঙ্কায় মোতিবাই তৎক্ষণাৎ পুঁটলির গিঁট খুলে দিলেন।

প্রভু রামভদ্র তাঁর কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। লালাভাউ বক্সীর অস্থিকলসে বাঁধা ছিল তাঁর গলায় থাকা এক বিশেষ ধরনের মুক্তোর মালা, আর তাতে যুক্ত ছিল একটি স্বতন্ত্র চিহ্নখচিত পদক, সেটিই নর্মদাবাইয়ের চোখে পড়ল।

নর্মদাবাই গভীর আবেগে সেই পদকটি হাতে তুলে নিলেন। তাতে খোদাই করা চিহ্নটি ভালো করে দেখে তিনি অশ্রুসজল কণ্ঠে বললেন, “চিমাবাই! আপনি আসলে কে? এটি তো লালাভাউ বক্সীর মালা! তিনি আমার আপন বড় ভাই ছিলেন এবং রানি লক্ষ্মীবাই এর সেনাবাহিনীর একজন সর্দার ছিলেন, এতটুকুই আমি জানি। এই পদক কেবল তাঁরই ছিল, আর এর চিহ্ন তাঁর জন্মপত্রিকার নির্দিষ্ট লক্ষণ অনুযায়ী। ভালো করে দেখুন, পদকের নকশার মধ্যেই তাঁর নাম খোদাই করা আছে। আমি আপনার সঙ্গে যাব।”

ভাস্কর ভট্ট দ্রুত তাঁর স্ত্রীকে শান্ত করতে করতে বললেন, “আমাদের ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। কারণ এই কলসে থাকা লালাভাউয়ের পদকের মতোই অন্য ব্যক্তিদের পরিচয়ের চিহ্নগুলিও শনাক্ত করা যেতে পারে।”

“মা! আপনার প্রকৃত নাম কী, তা আমাকে বলুন। কারণ লালাভাউ বক্সী শুধু আমার স্ত্রীর আপন ভাইই ছিলেন না, তিনি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুও ছিলেন। তাঁর অস্থি যদি আপনার কাছে থাকে, তবে তার অর্থ আপনি নিশ্চয়ই রানি লক্ষ্মীবাই এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন!”

মোতিবাই এরপর বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে সংক্ষেপে সব কথা জানালেন। তা শুনতে শুনতে ভাস্কর ভট্ট হঠাৎ অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি রানি লক্ষ্মীবাই এর অস্থিকলস কপালে স্পর্শ করে অত্যন্ত নিম্নস্বরে বললেন, “রানি লক্ষ্মীবাই আমার আপন মাসতুতো এবং পিসতুতো বোনও ছিলেন। আমরা একই বংশের। এখন থেকে পরবর্তী সমস্ত দায়িত্ব আমার।”

ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সময় ৫০-৬০ যাত্রী এসে রামমন্দির প্রাঙ্গণে (বড় আঙিনায়) সমবেত হলেন। মোতিবাইয়ের সঙ্গে ভাস্কর ভট্ট, নর্মদাবাই ও সুভদ্রাবাই তো আত্মীয়স্বজনের মতোই যাচ্ছিলেন। ভাস্কর ভট্ট যে যাত্রীদলটি সংগৃহীত করেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকেই একসময় রানি লক্ষ্মীবাই-এর সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন এবং মোতিবাইয়ের প্রকৃত পরিচয় ও তাঁর মর্যাদা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন।

কাশীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো। মোতিবাই বৃদ্ধা, মুণ্ডিতমস্তক বিধবার ছদ্মবেশেই চলছিলেন। অস্থিকলসগুলি এতজনের সামগ্রীর মধ্যে গোপনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকেই ‌‘নিজেদের কিছু করার সুযোগ মিলেছে‌’ এই ভাব নিয়ে এক এক পা ফেলছিল।

এগারো দিনের দীর্ঘ যাত্রার পর দূরে কাশী বিশ্বনাথের শিখর চোখে পড়তে শুরু করল।

(কথা চলবে)

Comments