ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 23

মলহাররাও নিজের অজান্তেই দুই হাত জোড় করে, সেখানে উপস্থিত সবার কানে পৌঁছায় এমন গলায় রানী লক্ষ্মীবাঈ এবং ভারতমাতার জয়ধ্বনি দিলেন।

গত পাঁচ দিন ধরে চলা ১৮৫৭-১৮৫৮ সালের এই স্বাধীনতা সংগ্রামের পবিত্র স্মৃতিচারণ সেখানকার প্রত্যেককে বারবার নাড়িয়ে দিয়েছিল, ভীষণভাবে আন্দোলিত করেছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই সব স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বীরত্বের সামনে ওখানের প্রতিটি মানুষ শ্রদ্ধায় নতজানু হয়েছিল। চোখের জল বারবার বাঁধ ভাঙতে চাইলেও কেউ তা আটকাতে পারছিল না, বরং প্রত্যেকের মনে দেশভক্তির ভাবনা আরও জোরালো হয়ে উঠছিল।


কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ নীরব থেকে মলহাররাও আবার বলতে শুরু করলেন,
“এই যুদ্ধের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই বিষয় নিয়ে বেশ জোরালো আলোচনা হয়েছিল। এই সমস্ত বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয় এবং সেই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (কুইন্স প্রোক্লেমেশন) ভারতের জন্য প্রণয়ন করা হয়।”

রানির এই ঘোষণাপত্রে যদিও অনেক বিষয় ছিল, তবুও প্রধান বিষয় ছিল পাঁচটি—
১) ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ রাজসত্তার, অর্থাৎ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও রানির হাতে চলে যায়।
২) যেসব দেশীয় রাজ্য তখনও খালিসা হয়নি (অর্থাৎ ব্রিটিশদের অধীনে যায়নি), তাদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা হবে এবং ব্রিটিশ দরবারে তাদের মর্যাদা দেওয়া হবে।
৩) যেসব রাজ্য খালিসা হয়ে গেছে (ব্রিটিশদের অধীনে চলে গেছে), তাদের শাসকদের নিকটাত্মীয়রা যদি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন, তবে তাদের মাসিক ভাতা দেওয়া হবে, যা ছিল যথেষ্ট পরিমাণ। এছাড়া তাদের মূল দুর্গ ছাড়া অন্যান্য প্রাসাদ ও হাভেলিগুলি ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৪) হিন্দু ধর্মে দত্তক গ্রহণের প্রথা স্বীকৃত হয় এবং দত্তক সন্তানদের হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী সব অধিকার দেওয়া হবে—সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজপরিবার পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই।
৫) ব্রিটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ভারতীয়দের ধর্মীয় বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং ভারতীয়দের তীর্থস্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

এই পাঁচটি বিষয়ের কারণে দেশীয় রাজ্যগুলির শাসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট সন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল; কারণ প্রশাসন-ব্যবস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যাওয়ায় কোম্পানির অবহেলাপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত শাসনের অবসান ঘটে। আর সবার মধ্যেই এই আশা জন্মেছিল যে, ‘জনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত ব্রিটিশ সরকার আর কোম্পানি সরকারের মতো অত্যাচারী আচরণ করবে না।’



এছাড়াও ধর্মীয় কার্যকলাপ ও তীর্থস্থান সম্পর্কে দেওয়া আশ্বাসের ফলে সাধারণ মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, আগের আক্রমণকারীদের মতো জোরপূর্বক ধর্মান্তর আর ঘটবে না। এই বিষয়টি সাধারণ ভারতীয় জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এছাড়াও ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে চালু হওয়া নানা আধুনিক সংস্কার ধীরে ধীরে বড় শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। এর ফলে ‘ব্রিটিশ সরকার ভালো’—এই ধারণা মানুষের মনে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে।

কিন্তু আসলে 'রানীর ঘোষণাপত্র' ছিল ব্রিটিশদের একটা ধূর্ত চাল। এই ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার রাজপরিবারগুলোকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নামা থেকে আটকাতে সফল হয়। রাজপরিবারের ছেলেমেয়েরা ব্রিটিশ সরকারের খাস স্কুল-কলেজে বা স্পেশাল ইউরোপিয়ান শিক্ষকদের কাছে পড়তে শুরু করে এবং খুব কম বয়সেই তারা উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যেতে থাকে। এর ফলে ধীরে ধীরে রাজা-জমিদাররা নিজেদের ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভাবতে শুরু করেন এবং ব্রিটিশ ভাইসরয় বা গভর্নরদের সামনে মাথা নত করতে তাদের কোনো দ্বিধাবোধ থাকল না।

সন্তুষ্ট দেশীয় রাজারা ব্রিটিশদের দেওয়া সীমিত ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রজাদের ক্রমশ আরও ব্রিটিশপন্থী (ব্রিটিশদের তোষণকারী) করে তুলতে শুরু করে। আর কেউ যদি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে চাইত, তার খবর পেলেই তাকে দমন করার ব্যবস্থা নেওয়া হতো।

ভারতীয় জনগণও এই ঘোষণাপত্রের ফলে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনেও এক ধরনের শান্তির অনুভূতি পেতে শুরু করেছিল; কিন্তু এই শান্তির পিছনে যতটা ইতিবাচক আশ্বাস ছিল, ততটাই ছিল এক চরম আতঙ্ক।

প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ সরকারও ১৮৫৭–৫৮ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে প্রকাশ্যে ও জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া বা শূলবিদ্ধ করার মতো ভয়াবহ কাজ অব্যাহত রেখেছিল।

ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রধান জেলায় ও গ্রামে, প্রায় প্রতিটি চৌরাস্তায় অনেককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল এবং তাদের মৃতদেহ সেভাবেই ঝুলিয়ে রাখা হতো। এই ভয়াবহ আতঙ্কের কারণে পরের প্রায় কুড়ি বছর সাধারণ মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করার সাহস পায়নি।


এমনকি রাওসাহেব পেশোয়া ও তাঁতিয়া টোপিকে ফাঁসি দেওয়ার পরেও পেশোয়াদের শহর পুনেতেও বিশেষ কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি; কারণ ব্রিটিশ সরকার মহারাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শহর পুনের মতো জায়গায় বিপুল সংখ্যায় সৈন্য মোতায়েন করেছিল এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ব্রিটিশদের এজেন্ট তৈরি হয়েছিল। এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এজেন্টরা আর্থিক লাভের আশায় প্রাণপণে কাজ করত এবং ব্রিটিশবিরোধী যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াত—এমনকি অনেক সময় সামাজিক অন্যায়ের অজুহাত দেখিয়েও।

ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে পড়াশোনা করার জন্য সব জাতির তরুণদের মধ্যে যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়; কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিরা নানা জায়গায় উচ্চপদ লাভ করতে থাকে। আর তাদের প্রাপ্ত সম্মান ও মর্যাদা দেখে আশপাশের অনেকেই একই পথ অনুসরণ করতে শুরু করে।

ব্রিটিশদের মতে মাত্র দু'বছরের মধ্যে অর্থাৎ ১৮৬০ সালের মধ্যেই ভারতীয় রাজন্যবর্গ এবং সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসন ও শ্রেষ্ঠত্ব পুরোপুরি মেনে নিয়েছিল। ১৮৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে ভাইসরয়ের পক্ষ থেকে ইংল্যান্ডে এমন একটা রিপোর্টও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ১৮৫৬ সালের ২৩ জুলাই রত্নগিরি জেলার 'চিখলি' নামে এক ছোট্ট গ্রামে ভারতমাতার এক সুযোগ্য সন্তানের জন্ম হয়েই গিয়েছিল, যাঁকে পরবর্তীকালে আমরা 'লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক' নামে চিনি। আর এই মহাপুরুষই কোকণ থেকে পুনেতে এসে “কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।”

( কথা চলবে)





Comments