ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 30

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 30

লোকমান্য তিলক তাঁর ‘কেসরি’ পত্রিকায় একেবারে স্পষ্ট ভাষায় ক্ষুদিরাম বসুর শহীদত্বের প্রশংসা করেন এবং বোঝান যে ‘মহিলাদের উপর আক্রমণ’ আসলে ভুল গাড়িতে বোমা নিক্ষেপের ফলেই ঘটেছিল।
এখানেই থেমে না থেকে তিলকজি আরও বলতে শুরু করেন যে ব্রিটিশদের অত্যাচার, কমিশনার ওয়াল্টার চার্লস র‍্যান্ড (প্লেগ মামলা) এবং চিফ ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড (সুশীল সেন মামলা) এর মতো ঘটনাগুলির মাধ্যমে ক্রমশ বেড়েই চলবে। তাই ভারতবাসীদের অবিলম্বে ‘স্বরাজ’ অর্থাৎ ‘সেল্ফ রুল’  (Self Rule) লাভের জন্য সব ধরনের উপায় অবলম্বন করে সংগ্রামে নামা উচিত এই মত তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। তিলকজীর এই ধরনের লেখাগুলি পরে অনুবাদ করে পুস্তিকা ও পত্রিকার মাধ্যমে ভারতের প্রতিটি প্রদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হতে থাকে।

অনেক দেশীয় ভারতীয় রাজ্যের রাজারা ‘তিলকজীর প্রকাশিত সংবাদপত্র বা তাতে লেখা প্রবন্ধের পুস্তিকা যেন তাদের রাজ্যে প্রবেশ করতে না পারে’ এই কারণে ব্রিটিশদের থেকেও বেশি কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁদের প্রজারা সেই শাসকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিতে শুরু করে। ফলে শেষপর্যন্ত রাজন্যবর্গকে বাল গঙ্গাধর তিলকের পত্রিকাগুলোর বিরোধিতা বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়।

কিন্তু এইসব ঘটনার ফলে ভারতে অবস্থানরত ব্রিটিশ সরকার বাল গঙ্গাধর তিলককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তাঁকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে গোপনে নানা পরিকল্পনা করা হতে থাকে। তবে লেবার পার্টির কিছু সদস্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং মত প্রকাশ করেন যে, ‘এই ধরনের গোপন পরিকল্পনার কথা যদি প্রকাশ্যে আসে, তবে ব্রিটিশরা একদিনও ভারতে টিকে থাকতে পারবে না।’

অবশেষে বাল গঙ্গাধর তিলকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয় এবং তাঁকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অর্থাৎ কালাপানির শাস্তি দেওয়া হয়। এই দণ্ড ভোগের জন্য তাঁকে ব্রহ্মদেশ (মায়ানমার) এর ম্যান্ডালের মতো এক ভয়ঙ্কর কারাগারে পাঠানো হয়।

এই মামলায় মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলকের প্রধান আইনজীবী, এবং তিনি তিলকজীর পক্ষে মামলা লড়ার জন্য দিন রাত এক করে পরিশ্রম করেছিলেন। (এই ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক জিন্নাহ পরবর্তীকালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর নানা ভুল সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের বিরোধিতায় চলে যান এবং শেষপর্যন্ত পাকিস্তানের জনক হয়ে ওঠেন।)

সাজা ঘোষণার পর বিচারপতি ডাবর      দিনশা তিলকজীর কাছে তাঁর মতামত জানতে চান।

লোকমান্য তিলক ভরা আদালতে গর্জে উঠে বললেন, “আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই যে জুরির সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, আমি নির্দোষ। এই জগতের ওপর আসল ক্ষমতা পরমাত্মার শক্তির এবং সেই ঈশ্বরই সবকিছু ঘটিয়ে থাকেন। আজ সেই সর্বশক্তিমান ভগবানের ইচ্ছা (The will of Omnipotent Providence) হয়তো এমনটাই যে, আমার বক্তৃতা ও আমার লেখার চেয়েও বহু গুণ বেশি জোরালো কাজ ও প্রভাব আমার জেলজীবনের কষ্টের মাধ্যমে তৈরি হোক।‌”

সমগ্র ভারতজুড়ে লোকমান্য তিলককে সমর্থন জানাতে এবং ব্রিটিশদের বিরোধিতা করতে মিছিল, জনসভা, আলোচনা সভা ও বক্তৃতার মতো দেশভক্তিপূর্ণ নানা কর্মসূচি অনেক দিন ধরে চলতে থাকল।

ব্রিটিশরা বাল গঙ্গাধর তিলক-কে ব্রহ্মদেশের ম্যান্ডালেতে নিয়ে যায় এবং তখন ৫২ বছর বয়সী, বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকে পড়া এই মানুষটির উপর অত্যন্ত নিষ্ঠুর অত্যাচার শুরু করে। নারকেলের ছোবড়া (Coir) ছাড়ানো ও তা থেকে দড়ি, চাটাই ও বস্তা তৈরি করার মতো কঠোর শ্রমের কাজ তাঁকে প্রতিদিনই করতে হতো।

এর পাশাপাশি বাল গঙ্গাধর তিলককে যে খাবার দেওয়া হতো, তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের (নিকৃষ্ট)। ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে প্রধানত মিষ্টিজাতীয় খাবারই দেওয়া হতো। সাধারণ খাবার তাঁকে দেওয়া হতো না, কারণ তিলকজীর সামান্য মধুমেহ (Early Diabetes) ছিল। তাঁর ওষুধও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, আর খাওয়ার জন্য শুধুই মিষ্টি দেওয়া হচ্ছিল ফলে লোকমান্য তিলকজীর ডায়াবেটিস দিন দিন আরও বেড়েই চলতে থাকে।

এর পাশাপাশি বাল গঙ্গাধর তিলক-কে কোনো রকম সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছিল। অন্যদিকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুকে ব্রিটিশ সরকার যখন কারাগারে রাখত, তখন তাঁদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ রাখা হতো এবং তাঁদের দিয়ে কোনো ধরনের কঠোর শ্রম করানো হতো না বরং ‘আগা খান প্যালেস’ এর মতো আরামদায়ক ও বিলাসবহুল স্থানে তাঁদের রাখা হতো।

এই কারণে ১৬ জুন ১৯১৪ সালে, অর্থাৎ পুরো ছয় বছরের শাস্তি ভোগ করার পর যখন বাল গঙ্গাধর তিলক কারাগার থেকে মুক্তি পান, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এক পা এগোনোও তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবুও এমন শারীরিক অবস্থার মধ্যেও তিলকজি তাঁর দেশভ্রমণের গতি একেবারেই কমাননি এবং নিজের লেখনীর মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আবারও জোরালো আক্রমণ শুরু করেন।

লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের কর্মকাণ্ড দেখে এবং সেই আচরণে বিরক্ত হয়ে ‘হোম রুল লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যানি বেসান্ত’ এর সহযোগিতায়।

ডঃ অ্যানি বেসান্ত ১৮৪৭ সালের ১ অক্টোবর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর  পিতৃগৃহের    নাম ছিল ‘অ্যানি উড’। তাঁর মা ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত এবং আইরিশ জনগণ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের জন্য লড়াই করছিল।

অ্যানি বেসান্ত আইরিশ ও ভারতীয় স্বাধীনতার এক দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনিও ভারতে এসে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যোগ দেন।

১৯০২ সালে ডঃ অ্যানি বেসান্ত অত্যন্ত কড়া ভাষায় ভারতের ওপর ব্রিটিশ শাসনের বর্ণনা দিয়েছিলেন, “ব্রিটিশরা ভারতের অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য শাসন করছে, এটা ডাহা মিথ্যে কথা। ইন্ডিয়াকে কেবল প্রচুর মুনাফা অর্জনের একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ইন্ডিয়ার নাগরিকদের (The sons of the land) ক্রীতদাসের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে।‌”

১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (First World War) শুরু হলো, তখন ব্রিটিশরা ভারত থেকে সৈন্য ভর্তি করতে শুরু করল। সেই সময় তিলকের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে ‌‘নিউ ইন্ডিয়া‌’ পত্রিকার সম্পাদিকা হিসেবে অ্যানি বেসান্ত গর্জে উঠলেন— “England‌’s need is India‌’s opportunity (ইংল্যান্ডের প্রয়োজনই হলো ভারতের জন্য বড় সুযোগ)।” 

১৯১৪ সালের পর তিলক পুনরায় জেলে যাওয়ার পর ডঃ অ্যানি বেসান্ত হোম রুল লিগের কাজ পুরোদমে চালিয়ে যান। ২৮ এপ্রিল ১৯১৬ সালে হোম রুল লিগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ডঃ বেসান্ত বেশির ভাগ সময় ভারতীয় পোশাকই পরতেন।

ম্যান্ডালেতে লোকমান্য তিলকজি কারাগারে বন্দী অবস্থায়, তিনি ‌‘গীতারহস্য‌’ নামে এক অসামান্য গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে ভগবদ্গীতার গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। কারাগারে তাঁকে নারকেলের আঁশ দিয়ে মোটা দড়ি তৈরির কঠোর কাজ করতে হতো, যার ফলে তাঁর হাতে বহু ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। তবুও সেই আহত ও ফুলে যাওয়া হাতেই তিনি কলম ধরে এই বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থ সমগ্র ভারতে কর্মযোগের এক প্রখর ও অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর লোকমান্য তিলকজি কার্যত সমগ্র ভারত জুড়ে ভ্রমণ শুরু করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি শত শত ছোট শহর এবং হাজার হাজার (প্রায় ৯০,০০০) গ্রামে গিয়েছিলেন। প্রতিটি স্থানেই তিনি সভার আয়োজন করে জনগণের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগিয়ে তুলতে থাকেন।

ভারতের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে জাগিয়ে তোলার কাজ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রথম কার্যত তিলকজিই শুরু করেছিলেন। এমনকি দেশের কোনো এক কোণে অবস্থিত ছোট্ট গ্রামেও তাঁর সভায় হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতেন, যদিও সেই গ্রামের জনসংখ্যা অনেক সময় মাত্র প্রায় ৫০০ জনই ছিল।

তিলকজির এই তুফানি সফর আর জোরালো লেখালেখিতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কেঁপে উঠতে লাগল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় গান্ধীজিকে অহিংসার অহেতুক গুণগান করা থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু পাঁচটি বৈঠকের পরেও গান্ধীজি তিলকজির কথা শুনতে স্পষ্ট অস্বীকার করেন এবং উল্টে কংগ্রেসের নরমপন্থী দলকে আরও শক্তিশালী করতে শুরু করেন।

তিলকজি ১৯১৬ সালে আবারও দেড় বছরের জন্য জেলে যান। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তাঁর কাজ অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১লা আগস্ট ১৯২০ সালে মুম্বইয়ের ‌‘সর্দার গৃহ‌’ নামক হোটেলে মাত্র একদিনের অসুখে তাঁর মৃত্যু হয়।


প্রতিটি ভারতীয়ের জন্য এটি ছিল এক প্রবল আঘাত। প্রায় সকলের মনেই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে ব্রিটিশরা তিলকজির উপর বিষ প্রয়োগ করেছিল। আসল সত্য কী, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।

(কথা চলবে)
मराठी >> हिंदी >> English >> ગુજરાતી>> ಕನ್ನಡ>> తెలుగు>> தமிழ்>> മലയാളം>>

Comments