ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, যেমনটি সাধারণত জানা যায়, তা একটি বিশাল এবং গভীর উপাখ্যানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। পরিচিত নাম এবং বিখ্যাত মাইলফলকগুলির বাইরে একটি না বলা আখ্যান রয়েছে, যা এমন পুরুষ ও মহিলাদের দ্বারা গঠিত হয়েছে যাঁদের ত্যাগ ছিল ঐশ্বরিক তুল্য, তবুও তাঁদের কাহিনী ইতিহাসের বই এবং স্মৃতি থেকে অনুপস্থিত রয়ে গেছে। 'দৈনিক প্রত্যক্ষ'-এ প্রকাশিত তাঁর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ সম্পাদকীয়গুলোতে ডক্টর অনিরুদ্ধ ডি. জোশী এই বিস্মৃত ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি যোদ্ধা, চিন্তাবিদ এবং নীরব পথপ্রদর্শকদের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের জীবন উন্মোচিত করেন যাঁরা মাতৃভূমির প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি, সাহস এবং ভক্তি নিয়ে দেশের নপাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
আখ্যানটি যত এগোয়, অসংখ্য না শোনা নাম সামনে আসতে থাকে, সেইসব ব্যক্তি যাঁদের জীবন বীরত্ব, ত্যাগ এবং স্বাধীনতার অটুট সংকল্প দ্বারা সংজ্ঞায়িত ছিল। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাইয়ের মতো আইকনিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি তাঁর সমকক্ষ সাহসী সহযোগীরা উঠে আসেন, যাঁদের বীরত্ব তাঁর সমান ছিল কিন্তু ইতিহাস তাঁদের নাম সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আখ্যানটি এরপর বাল গঙ্গাধর তিলকের যুগে প্রবেশ করে, যা তাঁর সুপরিচিত জনভাবমূর্তির চেয়ে অনেক গভীর একটি দিক প্রকাশ করে। এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই সম্পাদকীয়গুলি তাঁর পাশে দাঁড়ানো অসংখ্য স্বল্প পরিচিত বিপ্লবী, সংগঠক এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের উন্মোচিত করবে। তাঁদের নীরব ত্যাগ, বৌদ্ধিক দৃঢ়তা এবং নির্ভীক পদক্ষেপ স্বাধীনতা আন্দোলনের মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল কিন্তু সেগুলি মূলত অলিখিত রয়ে গেছে কারণ এই প্রকৃত অখ্যাত নায়কদের তথাকথিত ইতিহাসবিদরা উপেক্ষা করেছেন।
এটি কেবলমাত্র একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়; এটি ভারতের স্বাধীনতার অদৃশ্য ভিত্তির প্রতি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি। সাহস, উৎসর্গ এবং নৈতিক শক্তিতে সমৃদ্ধ এই আখ্যানগুলি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত গভীরতাকে পুনরায় আবিষ্কার করতে এবং যাঁরা সব দিয়েছিলেন অথচ বিনিময়ে কিছুই চাননি তাঁদের সম্মান জানাতে আমন্ত্রণ জানায়।
-------------------------------------------------------------------------------------
ভাগ - 1
লেখক - ডাঃ অনিরুদ্ধ ডি যোশী
এছাড়াও, মল্লাররাওয়ের বাগানের জমি খুব বড় ছিল। দেড়শো একরের কেবল আমবাগানই ছিল। এছাড়াও কলার বাগান, ডালিমের বাগান, পেঁপের বাগান, পেয়ারার বাগান মিলিয়ে প্রায় আটশো একর জমি ছিল। অতিরিক্ত অর্থাৎ যেখানে সেখানে পতিত জমিও ছিল, যেখানে ঘাস জন্মাতো এবং তার আঁটি বেঁধে পশু খাদ্যের জন্য বিক্রি করা হতো। সাতটি জঙ্গলের মালিকানাও তার কাছে ছিল। সেই জঙ্গলের বড় বড় গাছ কেটে, তা থেকে কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা তৈরির কারখানাগুলোও মল্লাররাও তৈরি করেছিলেন। মল্লাররাওয়ের জ্বালানি কাঠের (রান্নার কাঠ) ব্যবসাও খুব জোরকদমে চলছিল।
এছাড়াও, দুশো একর জমিতে গরু, মহিষ, ছাগল পালন করা হতো। দুধের ব্যবসাও খুব লাভজনক ছিল এবং গত বছর থেকে মল্লাররাওয়ের একমাত্র আদরের ছেলে রামচন্দ্র হাঁস-মুরগি পালনের (পোল্ট্রি ফার্ম) জন্য বিশেষ জায়গা নিয়েছিল। সেখানে সেই মতো সমস্ত ব্যবস্থাও করেছিল এবং গোবিন্দদাজী নামের একজন অভিজ্ঞ কর্মীকে, যে অন্য একজন ব্যবসায়ীর চাকরি থেকে অপমানিত হয়ে সেই চাকরি ত্যাগ করেছিলেন তাকে সেখানকার ম্যানেজার নিযুক্ত করেছিল।
আজ কিছুটা গণ্ডগোল হয়েছিল তার কারণ তাদের মাঠে কাজ করত এমন অনেক কৃষি শ্রমিক পাশের গ্রাম থেকে আসত এবং সেই গ্রামে ব্রিটিশ অফিসাররা পরিদর্শনের জন্য আসায় গ্রাম থেকে বেরোনোর উপর সবার নিষেধাজ্ঞা ছিল তাই সেই দিন তারা কাজে অনুপস্থিত ছিল।
সেটা ছিল বিপ্লবীদের যুগ এবং কিছু মারাঠিভাষী তরুণ বিপ্লবী সেই গ্রামে যাতায়াত করত বলে কোনো এক বিশ্বাসঘাতক (Traitor) ব্রিটিশ শাসকদের খবর দিয়েছিল। ভগত সিংকে দুই মাস আগে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল এবং ভারতের কোণায় কোণায় বিপ্লবের উষ্ণ রক্ত জ্বলে উঠছিল।
তাই আজ মল্লাররাওয়ের উপর খুব চাপ পড়েছিল। তাকে নিজে কাজে নামতে হয়েছিল। তার পুত্র রামচন্দ্র প্রথমে মুম্বাইয়ের একটি সুতাকলে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি করত। কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষা দেখে ব্রিটিশ গভর্নর রামচন্দ্রকে গভর্নমেন্ট সার্ভিসের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। সে বড় গভর্নমেন্ট অফিসার হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাছে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশের দক্ষিণ ভাগ এবং কর্ণাটকের উত্তর ভাগ এত বড় অঞ্চলের বন বিভাগ ছিল। সে সেই বিভাগের সর্বেসর্বা ছিল। সে সরাসরি গভর্নরের কাছেই রিপোর্ট করত। তার এবং গভর্নরের মধ্যে অন্য কোনো ব্রিটিশ অফিসার ছিল না এবং ভারতীয় অফিসার তো হতেই পারত না।
রামচন্দ্র সবসময় সফরে থাকতেন। মুম্বাইয়ের ‘কোট’ (ফোর্ট) এলাকায় (পরিসরে) তার সরকার প্রদত্ত বিশাল, সত্যি বলতে কি বিশাল আকারের বাংলো ছিল। গভর্নরের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারতেন এমন মাত্র দুই-তিনজন প্রাদেশিক অফিসার ছিলেন। তাদের মধ্যে রামচন্দ্রের নাম সবচেয়ে উপরে ছিল।
শুধু তাই নয়, গত চার বছরে সে যে কাজ দেখিয়েছিল তার কারণে ভারতের ভাইসরয়ের সঙ্গে (ভারতে ব্রিটিশদের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা) তার তিনবার সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং সেটিও অন্য কারোর উপস্থিত না থাকার সময়, ভাইসরয়ের স্পেশাল হলে, ভাইসরয়, ঐ এলাকার গভর্নর এবং রামচন্দ্র। এর ফলে রামচন্দ্রের দাপট তার এলাকায় তো ছিলই, আবার অনেকটা পরিমাণে ভারতের অন্যত্রও ছিল।
কেবল মল্লাররাওই জানতেন যে রামচন্দ্রের কাছে আপাতদৃষ্টিতে শুধু বন ও কৃষি বিভাগ থাকলেও, আসল কথা হলো তার নিকট সেই এলাকার স্বাধীনতা আন্দোলন দুর্বল করার দায়িত্ব ছিল।
যখন এই দায়িত্ব রামচন্দ্রের উপর অর্পণ করা হলো, রামচন্দ্র তার বাবাকে তাড়াতাড়ি মুম্বাইয়ে ডেকে নিয়েছিলেন, কারণ মল্লাররাও লোকমান্য তিলকের পরম ভক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি প্রকাশ্যে না থাকলেও, সেই কাজের জন্য অর্থ সরবরাহ করা, গোপন পত্রিকা ছাপানো, স্বাধীনতাকামী বীরদের গোপনে থাকার জন্য জায়গা দেওয়া, তাদের খাওয়া-দাওয়া এবং গোপনীয়তার যত্ন নেওয়া এবং প্রধানত লোকমান্য তিলকের সংবাদপত্রের অগ্রলেখ প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রামবাসীদের কাছে পড়ে শোনানো, এমন কাজ তিনি করতেন।
লোকমান্য তিলক 1920 সালে প্রয়াত হওয়ার পর ন. চিঁ. কেলকর তার সংবাদপত্রগুলো চালু রেখেছিলেন। গান্ধীজির অহিংসবাদী চিন্তাধারার প্রভাব বাড়ছিল। 1928 সালের ডান্ডি যাত্রায় অর্থাৎ লবণের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে মল্লাররাও অংশও নিয়েছিলেন। কিন্তু এই অত্যাচারী বিদেশী শক্তি অহিংসার পথে স্বাধীনতা দেবে এই বিষয়ে মল্লাররাওয়ের বিশ্বাস 1928 সালেই চলে গিয়েছিল কারণ তার চোখের সামনে অনেক নিরস্ত্র, নিরপরাধ, নির্দোষ মানুষের, এমনকি বৃদ্ধ ও মহিলাদেরও মাথায় আঘাত পেতে তিনি দেখেছিলেন এবং যোদ্ধার ঐতিহ্য থাকা মল্লাররাওয়ের পক্ষে তা সহ্য হয়নি।
কিন্তু লোকমান্য তিলক তো চলে গিয়েছিলেন। গান্ধীজি অহিংসার পথে দৃঢ় ছিলেন। বাংলায় এবং পাঞ্জাবে বিপ্লবীরা বিদ্রোহ করছিলেন। কিন্তু স্থানীয় ভারতীয়দের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে সমস্ত বিপ্লবী ধরা পড়ছিলেন এবং তাদের ফাঁসি দেওয়া হচ্ছিল নয়তো তারা সরাসরি ব্রিটিশের গুলির শিকার হচ্ছিলেন।
এটি দেখে মল্লাররাও গত তিন বছর ধরে সক্রিয় সংগ্রাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তিনি পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সত্যি বলতে কি, তিনি কোনো সঠিক পথপ্রদর্শক পাচ্ছিলেন না। রামচন্দ্রকে এই গোপন কাজটি ব্রিটিশরা সব তথ্য বের করে তারপরই দিয়েছিল। তাদের রিপোর্টে লেখা ছিল - ‘রামচন্দ্র রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে। তার বাবা মল্লাররাও অতি ধনী জমিদার, কৃষক ও ব্যবসায়ী এবং তিলকের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।’ এই রিপোর্টের কারণেই রামচন্দ্র এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
মল্লাররাও সবকিছু শান্তভাবে শুনে নিলেন এবং চোখ বন্ধ করে ও মাথা নিচু করে তার প্রিয় আরাম কেদারায় শান্তভাবে বসে রইলেন। সেই পাঁচ মিনিটের সম্পূর্ণ নীরবতা রামচন্দ্রের নিকট অসহ্য মনে হচ্ছিল। পাঁচ মিনিট পরে মল্লাররাওয়ের আরাম কেদারা একটি শান্ত ছন্দে দুলতে শুরু করল। সেই সময়ে দোল খাওয়া আরাম কেদারা ছিল।
(গল্পটি চলছে)
.jpg)





Comments
Post a Comment