দুঃখের বন্ধন থেকে মুক্তি দেওয়া রামবাণ
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ রামরক্ষা স্তোত্রমন্ত্র মালিকার ৭ম প্রবচনে বলছেন যে, যেমন আকাশ থেকে পড়া প্রতিটি জলবিন্দু , শেষমেশ সমুদ্রেই গিয়ে মেশে, তেমনই যে কোনও ভাষা বা প্রদেশ থেকে আসা ভগবানের বিভিন্ন পবিত্র রূপের ভক্তি সেই পরমেশ্বরের কাছেই গিয়ে পৌঁছায়। এই ভক্তি আর প্রেমের কোনও বন্ধন থাকে না। কিন্তু মানব জীবনে দুঃখের অনেক বন্ধনে আমরা জড়িয়ে থাকি, তা থেকে নিজেদের মুক্ত করার আসল উপায় হল রামবাণ। এইজন্যই রামবাণ উপায় বা রামবাণ ওষুধ ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করে থাকি।
ধৃতশরধনুষম্ — হাতে ধনুকে তীর লাগানো অবস্থায় রাম
রামরক্ষার ধ্যানমন্ত্রে রামের বর্ণনা ধ্যায়েদাজানুবাহুম্ ধৃতশরধনুষম্ এমন আছে, অর্থাৎ যিনি হাতে ধনুক-তীর ধারণ করে আছেন এমন রাম। রামকে সবসময় শুধুমাত্র ধনুক-তীর ধারণ করতেই দেখা যায়, অন্য কোনও অস্ত্র তিনি ধারণ করেন না। এইজন্যই বুধকৌশিক মানেই হলো বিশ্বামিত্র ঋষি, যিনি হাতের ধনুকে তীর লাগিয়ে রেখেছেন এমন অবস্থার রামের ধ্যান করতে বলেন।
রামের তীরের সাতটি অদ্বিতীয় গুণ
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ এই প্রবচনে রামের তীরের সাতটি অদ্বিতীয় গুণের কথা বলেছেন। তার মধ্যে প্রথম হল, এটি সবসময় নির্ভুল হয় এবং সেই তীরের নির্ভুলতা ও কাজ রামের ইচ্ছে অনুসারেই হয়। রামের ইচ্ছেমতো যদি তীর শত্রুর বুকের এপার-ওপার চলে যাওয়ার কথা থাকে কিন্তু তার প্রাণ নেবে না এমন হয়, তবে তেমনটাই ঘটে। এই তীরের বিশেষত্ব এই যে, এটি শুধু মন্দের বিনাশ করে এবং কখনও ভুল করে না।
শয়তান মানে অভাব — রামবাণ মানে ভাবনির্মিতি
পরমেশ্বর কখনও কারও খারাপ করেন না। পরমেশ্বর ভাবস্বরূপ। পরমেশ্বরের অভাব আমার মনে তৈরি হওয়াই হল শয়তান। এইজন্যই অভাবের অর্থাৎ শয়তানের আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই। এই অবস্থায় পরমেশ্বর শুধু সাক্ষীরূপে থাকেন, ফলে তাঁর ক্রিয়াশীলতা যেখানে থাকে না সেখানেই শয়তানি বৃত্তির উদয় হয় এবং রামবাণ যখন এমন শয়তানের বুকের ওপর দিয়ে, শয়তানি বৃত্তির মানুষের বুকের ওপর দিয়ে যায়, তখন তা ভাব উৎপন্ন করে। রামবাণ সদাই নির্ভুল হয়ে থাকে ; ভুল শুধরে থাকে, এইরকম।
সদগুরু অনিরুদ্ধ বাপু একটি গল্পের মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন যে রামের তীর অভাব মেটানোর জন্য অন্য জায়গা থেকে কিছু আনে না, বরং যেখানে অভাব আছে সেখানেই ভাব নির্মাণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি রামকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তীর মেরে গঙ্গা আনতে হয়, তবে তিনি সেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে যেখানে গঙ্গা আছে সেখান পর্যন্ত তার তীরে জমি ফুটো করে গঙ্গা আনার বদলে, রাম যেখানে তীর মারেন সেখানেই গঙ্গা উৎপন্ন হয়। রাম ধনুকে তীর লাগিয়েছেন এমন আমরা তার ধ্যান করার সময়, এই তীর আমার মধ্যে এসে আমার সব খারাপ দূর করবে, আমার প্রারব্ধের নাশ করবে এই চিন্তা যখন আমার মনে আরও বেশি করে দৃঢ় হতে থাকে, তখন আমার অষ্টভাব জাগ্রত হয়ে আমার চোখ দিয়ে যে জল বইতে শুরু করবে , তা গঙ্গা হয়ে যায় ; আর রামের তীরে উৎপন্ন গঙ্গা আমার সম্পূর্ণ জীবনে পবিত্রতা এনে দেয়।
ক্ষত সারিয়ে ফিরে আসা রামবাণ
রামের তীরের দ্বিতীয় বিশেষত্ব হল রাম তার তীর যে দিকে পাঠান সেই দিক থেকেই ফিরে আসে। এই তীরের ফলে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল সেই ক্ষত সারিয়েই সেই তীর ফিরে আসে। ক্ষত হল মানে শরীরের কোষগুলোর অভাব তৈরি হল। সেই অভাবকে ভাবে রূপান্তর করার জন্য সেই তীর ব্যবহৃত হয়ে আবার সেই দিক থেকেই ফিরে আসে অর্থাৎ তার অক্ষয় তূণীরে ফিরে আসে।
বেদনাহীন ও রক্তহীন রামবাণ
তৃতীয় বিশেষত্ব হল রামের তীরে কখনও রক্ত লাগে না এবং রামবাণ কখনও বেদনা দেয় না। রামের তীর যখনই কোনও সজীবের শরীরের মধ্যে ঢোকে, সেই সজীব যত বড় পাপীই হোক বা পুণ্যবান হোক, তার শরীর রামের তীরকে স্বাগত জানায়। সেই তীরকে সজীবের শরীরের প্রতিটি ভাগ পথ করে দেয়।
১০৮ শক্তিকেন্দ্র জাগ্রত করা রামবাণ
চতুর্থ বিশেষত্ব হল রামের তীর শরীরের যে কোনও অংশ দিয়ে গেলে, তা সম্পূর্ণ শরীরের সমস্ত ১০৮ শক্তিকেন্দ্রকে জাগ্রত করে।
আবাহন/আহ্বান ছাড়া অব্যবহৃত রামবাণ
রামের তীরের পঞ্চম বিশেষত্ব হল উল্টো দিকের মানুষ আবাহন না করলে বা আহ্বান না দিলে রাম কখনও তীর ছোঁড়েন না। তীর শুধু আবাহন বা আহ্বান দিলেই বেরোয়। রাম পূর্ণ সত্ত্বগুণী হওয়ার কারণে তিনি অচল (Masterly Inactive)। আমরা তাকে যতক্ষণ আবাহন না করি ততক্ষণ তিনি সচল হন না এবং তীর ছোঁড়েন না। রামের প্ল্যান সবসময় অপর দিকের মানুষের ওপরই নির্ভর করে। এইজন্যই তাকে সচল করার জন্য রাবণের চেয়ে হনুমানের মতো ভক্ত হওয়া সবসময়ই ভালো।
প্রেম ও দ্বেষ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রামবাণের সংখ্যা
ষষ্ঠ বিশেষত্ব হল আমাদের রামের ওপর প্রেম ও ভক্তি যত গভীর, তত কম তীরের প্রয়োজন হয়; আর এর উল্টোদিকে দ্বেষ যত বেশি, তত বেশি তীরের প্রয়োজন হয়। এই ব্যাপারে সদগুরু অনিরুদ্ধ বাপু বলেন যে রাম রাবণের জন্য অসংখ্য তীর ব্যবহার করেছিলেন কিন্তু আমরা আগের প্রবচনের গল্পে যেমন শুনেছি হনুমানকে মারা একটি তীরেই রাম নিজেও ঘায়েল হয়েছিলেন।
ধ্যাস (টান) লাগলে তবেই নিক্ষিপ্ত হয় রামবাণ
রামের তীরের সপ্তম বিশেষত্ব হল রামের তীর শুধু তখনই বেরোয় যতক্ষণ উল্টো দিকের মানুষ শত্রুতা বা মিত্রতায় রামের ধ্যাস (আকর্ষণ) না বোধ করে। আর আমাদের একবার রামের ধ্যাস (টান) লাগলে রামের তীর বেরোয় এবং রামেরও আমাদের ধ্যাস লাগে। সন্ত কবীরদাস বলেন — রাম হামারা জপ করে, হাম বৈঠে আরাম। অর্থাৎ যখন আমরা রামের ধ্যাস ধরি, তখন রামেরও আমাদের ধ্যাস লাগে। সাংসারিক জীবনে যে কোনও কিছুর ধ্যাস ধরুন, কিন্তু রামের ধ্যাস সবসময় বজায় রাখুন; তারপর রামের যে কোনও রূপই হোক, কৃষ্ণ হোক বা মহাবিষ্ণু হোক। তিনি একই। এমন ৭টি বিশেষত্ব থাকা তীর আমাদের ধনুকে লাগানো আছে। এই ধনুকও একটি বিশেষ ধনুক। তার তিনটি গুণ আছে:
রামের নিরাকার ধনুক
রামের ধনুক নিরাকার, অর্থাৎ এর কোনও নির্দিষ্ট আকার নেই। এটি রামের ইচ্ছে অনুসারেই যেমন দরকার তেমন আকার যখন দরকার তখন তা ধারণ করতে পারে।
জীবনে রামের স্থৈর্য প্রদানকারী রামের ধনুক
রামের ধনুক সর্বদা অধঃ-উর্ধ্ব এই দুই দিকে স্থির থাকে। অর্থাৎ এটি সোজা থাকে, বাঁকা হয় না। এই ধনুক তীরকে যোগ্য গতি ও স্থৈর্য দেয়। রামের ধনুকের অধঃ দিক অর্থাৎ নিচের দিকটা তীর জোড়ার পরেও মাটিতে ঠেকে থাকে, পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক রাখা হয় বলে এটি স্থির থাকে। রাম নিজের ভক্তকে তার উপাসনার যে ফল সে সইতে পারবে সেটুকুই ফল দেন।
রামের সর্বদা কর্মরত থাকা ধনুক
রামের অবতারের আগে এবং পরেও এই ধনুক সক্রিয় আছে। বাস্তবে রামের ধনুক মানে হনুমান। হনুমান মানে রামের ধনুক, আর তার গদা মানে রামনাম। তাই যেখানে রামনাম আছে সেখানে হনুমান থাকবেই। রাম-হনুমানের সম্পর্ক অটুট।
রামের অস্ত্র এবং লক্ষণ, সীতা ও হনুমান
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ আরও বলেন , রামের ধনুক, রামের তীর এবং রামের তূণীর এই তিনটি অস্ত্রের মালিকানা বাস্তবে রামের নয়, তাদের সামলানো ও নিয়ন্ত্রণ মহশেষ লক্ষ্মণ করে থাকেন। অর্থাৎ রামের তীর, রামের ধনুক এবং রামের তূণীর, এগুলো রামের শরীর থেকে খুলে রাখা এবং আবার রামের শরীরে তা পরানো এই কাজ শুধু ওই একমাত্র মহাশেষ লক্ষ্মণই করতে পারেন। রামের ধনুক মানে হনুমান, আর এই ধনুক ব্যবহার করার ইচ্ছাশক্তি মানেই হলো সীতামায়ী ।
রামের তীরের কাজ হল আমাদের জীবনের পুরুষার্থ যা পার হয়ে গেছে বা ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ, ভক্তি বা মর্যাদা এই পুরুষার্থের যে অভাব উৎপন্ন হয়েছে সেই পুরুষার্থকে আবার সিদ্ধ প্রতিপন্ন করা। এর জন্য আমাদের রামরক্ষা পাঠ করার সময় রামের ধ্যান করার সময় ধৃতশরধনুষম্ রাম অর্থাৎ তার তূণীর সমেত, তীর সমেত এবং ধনুক সমেত রামকে আমাদের চোখের সামনে আনা প্রয়োজন।
ভগবানের শরণে যাওয়ার জন্য উন্মাদনাই হলো ধ্যানমন্ত্র
শেষে বাপু বলেন যে ধ্যানমন্ত্র বলার সময় যতটা সম্ভব ততটা ধ্যান করার চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য রামরক্ষা বলার সময়, ধ্যান করার সময় একেকটা শব্দের ওপর লক্ষ্য দিলেই যথেষ্ট। ধ্যানমন্ত্রের কাজ কী? তো , এই ধ্যানমন্ত্রের জন্যই আমার ভগবানের নামের প্রতি উন্মাদনা জাগে, আমার ভগবানের স্তুতির প্রতি উন্মাদনা জাগে। আমার ভগবানের রূপের প্রতি এক প্রবল আগ্রহ জেগে ওঠে।আমার ভগবানের শরণে যাওয়ার জন্য প্রবল ব্যাকুলতা জাগে। এই সবকিছু করার কাজ যে করে তাই হলো ধ্যানমন্ত্র।

Comments
Post a Comment