রামরক্ষা ধ্যানমন্ত্র - “পীতং বাসো বসানং”- এর অর্থ
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ বাপু রামরক্ষা স্তোত্রমন্ত্র মালিকার ৮ম প্রবচনে বলছেন, রামরক্ষার ধ্যানমন্ত্রে “পীতং বাসো বসানং” মানে হলুদ বস্ত্র পরা রামের বর্ণনা আছে। হলুদ রঙটা রামের, অর্থাৎ মহাবিষ্ণুর সেই সদগুরুতত্ত্বের গুণধর্মের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
বাপু সন্ত জনাবাইয়ের একটা অভঙ্গের ’নাচতা নাচতা হরীচা পীতাম্বর সুটলা, সাবর সাবর দেবা অইসে কবীর বোললা’ (নাচতে নাচতে হরির পীতাম্বর খসে পড়ল, সামলাও সামলাও ঠাকুর এমনটা কবীর বললেন) এই লাইনটার আধ্যাত্মিক অর্থ বলতে গিয়ে বলছেন যে, পান্ডুরঙ্গের পীতাম্বর খসে পড়ে মানে যখন ভক্ত নামে, ভজনে, নাচে পুরো তলিয়ে যায় অর্থাৎ মগ্ন হয়ে যায়, তখন ঠাকুরের সগুণ রূপ মানে তার বাইরের আবরণ সরে যায় আর তার আসল মূল স্বরূপ দেখা দিতে থাকে। কিন্তু ভক্ত তা সহ্য করতে পারে না তাই সন্ত কবীর বলেন “দেবা, সাবর (সামলাও)!”
সগুণ-সাকার আর নির্গুণ-নিরাকারের মাঝের স্থিতি
সগুণ-সাকার আর নির্গুণ-নিরাকার এই দুটো রূপই সমান শ্রেষ্ঠ, কিন্তু এদের মাঝখানে একটা এলাকা আছে — সগুণ নিরাকার। যেমন হাওয়া দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়, তেমনই এই সগুণ নিরাকার এলাকা। এই সগুণ নিরাকার এলাকা মানেই “পীত বস্ত্র (হলুদ কাপড়)”, তাই রামের হলুদ বস্ত্র মানে শুধু জামাকাপড় নয়, বরং ঠাকুরের মূল স্বরূপ আর তার সগুণ রূপের মাঝের চাদর বা পর্দা।
ভক্তিতে মগ্ন হওয়া - অজ্ঞানের পর্দা সরে যাওয়ার মুহূর্ত
এই মূল পরমাত্মা সগুণ সাকার হয়ে এসেছেন এবং তবুও তার মূল রূপ দেখার ইচ্ছে ভক্তদের থাকেই। কিন্তু সম্পূর্ণ অষ্টভাব দিয়ে, ভক্তের শরীর, মন, বুদ্ধি, পঞ্চপ্রাণ, আত্মা সবকিছুই শুধু এই ভগবানের নামস্মরণে, গর্জনে যখন মগ্ন হয়, সেই মুহূর্তেই ভক্তের কাছে পরমাত্মার এক একটা স্বরূপ দেখা দিতে শুরু করে। ভক্ত ভক্তিতে যতক্ষণ নিজের হুঁশ না হারায়, মগ্ন না হয় ততক্ষণ অজ্ঞানের পর্দা সরে যাওয়া সম্ভব নয়।
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ এগিয়ে বলছেন, ভগবানের মূর্তিপূজা মানে শুধু ফুল চড়ানো, জল দেওয়া এতটুকুর মধ্যেই আটকে নেই। আসল পূজা তখনই সেই ভগবানের কাছে পৌঁছায় যখন মনে ভাব আসে যে এটা কেবল মূর্তি নয় আমার ভগবানই। এই ভাব মানেই সগুণ-নিরাকার ভাব, আর এই সগুণ নিরাকারতা মানেই ‘পীতবস্ত্র’। যখন এই ভাব দৃঢ় হয় তখন ভক্ত বেহুঁশ হয়ে যায় আর পরমাত্মার এক একটা সগুণ স্বরূপ আমার সামনে আপনাআপনিই প্রকট হতে থাকে এবং তারও ওপারে গিয়ে আমার তার নির্গুণ নিরাকার স্বরূপেরও উপলব্ধি হয়। বেদ বলে – “নেতি নেতি” – মানে এমন নয়, তেমনও নয়; এমন বলতে বলতে আমরা আসল অনুভব পাই। যেমন কোনও মানুষের ব্যাপারে বোঝা যায় যে সে খারাপ নয়, তখন আপনাআপনিই বোঝা যায় যে সে ভালোই।
সেইভাবেই পরমেশ্বরের ব্যাপারে সগুণ-নিরাকার ভাব আমাদের মনে উৎপন্ন হয় আর স্থির হয়, আমাদের প্রাণে স্থির হয় আর আমরা বুঝতে পারি যে এটা মূর্তি নয়, ইনি পরমাত্মাই, ইনি আমার ঠাকুরই, ইনি সবকিছু করতে পারেন। ইনি আমার প্রত্যেকটা কথা শুনছেন, দেখছেন, ইনি সবকিছু বুঝতে পারছেন, এই ভাব আমার যতটা শক্ত হতে থাকে, একশো আট শতাংশ হয়, সেই মুহূর্তে পীতাম্বর খসে পড়ে।
ভক্ত আর ভগবানের মধ্যেকার ‘অন্তরপাট’ (পর্দা) মানে পীতবস্ত্র
পীতবস্ত্র মানে ভক্ত আর ভগবানের মাঝখানের অন্তরপাট। বিয়ে হওয়া পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা দূরত্ব থাকা উচিত বলে মাঝখানে একটা কাপড় ধরা হয় তাকে অন্তরপাট বলে। বিয়ের অন্তরপাট যেমন ’শুভমঙ্গল সাবধান’ বলার পর সরে যায়, তেমনই ভক্ত ও ভগবানের মাঝের দূরত্ব ভক্তি ও ধ্যানের মাধ্যমে দূর হয়। পরমেশ্বর আর আমি এদের মাঝখানে আমি যতটা পরমেশ্বরের থেকে দূরে আছি সেই দূরত্ব মানে মায়া আর যতটা আমি পরমেশ্বরের কাছে আছি, সেই নৈকট্য মানে শুদ্ধবিদ্যা। আমাদের দুজনের মধ্যে এই যে পর্দা আছে, এই যে দূরত্ব আছে সেটা আমাদের তার অর্থাৎ সেই রামেরই ধ্যান করে, তার সেই পীতবস্ত্রের ধ্যান করে দূর করতে হবে।
এরপরে বাপু বারকরী সম্প্রদায়ের সন্ত জনাবাইয়ের গল্পের মাধ্যমে পীতাম্বরের পেছনের ভাব বুঝিয়ে বললেন। বুধকৌশিক ঋষি এই রামরক্ষাতে বলছেন যে এই পীতবস্ত্রধারী রামের ধ্যান সগুণ-নিরাকার ভাবে করা উচিত। আমাদের ভাব, আমাদের ভক্তি বেশিরভাগ সময় কিছু পাওয়ার জন্য অর্থাৎ সাকার আর কাম্যভক্তি হয়—অমুক পেলে ভক্তি, নইলে অন্য দেবতা। কিন্তু পরমেশ্বর একজনই, ‘সবকা মালিক এক’। তাই ভক্তি ফলের জন্য নয় বরং পরমেশ্বরকে পাওয়ার জন্য হওয়া উচিত। ঠাকুরকে আমাদের আকারে আটকে রাখা উচিত নয়; তিনি ‘কেশব’—মানে আকৃতির ওপরের। ভক্তি নিরাকার ভাবের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো হওয়া উচিত।
পীতবর্ণ (হলুদ রঙ) — পরমেশ্বরী শক্তির উদয়ের রঙ
রাম আর কৃষ্ণ দুজনেই হলুদ পীতাম্বর পরেন। এই হলুদ রঙ মানে পরমেশ্বরী শক্তির উদয়ের রঙ। যেমন সূর্য ওঠার সময় সোনালী হলুদ রঙ দেখা দেয়, তেমনই এই পীতবর্ণ মানে পরমেশ্বরী শক্তির প্রকাশ। রাম সূর্যবংশীই, সাক্ষাৎ সূর্যই। এই আকাশে দেখা যাওয়া সূর্য মানে রাম নয়, বরং এমন অনন্ত সূর্যের যিনি সূর্য, যিনি সবিতৃ তিনি রাম। রামের ধ্যান করার সময়, আমার চোখের সামনে বা মনে এই পীতবস্ত্র যখন দেখা দিতে শুরু করবে তখন আমার মনে এই প্রার্থনাই করা উচিত যে ‘পীতবস্ত্র মানে রামের উদয়’। আমি ‘পীতং বাসো বসানং’ বলি, তখন আমার মনে রামের উদয় হতে থাকে। এইজন্যই রামরক্ষার ধ্যানমন্ত্রে ‘পীতং বাসো বসানং’ এসেছে।
পরমেশ্বর আর পরমেশ্বরের কৃপা এগুলো আলাদা বিষয় নয়। এইজন্যই আমার মনে রামের উদয় হয়েছে মানে তার কৃপা হয়েছেই। এর জন্য আমাকে ‘সগুণ নিরাকার’ ভাবের পীতাম্বর ধারণ করতে হবে। আমি যেই মুহূর্তে সেই পীতাম্বর ধারণ করব সেই মুহূর্তেই আমি সেই রামের ধ্যান ঠিকঠাক করতে পারব। আমি রামের পীতাম্বর ধারণ করা মানে রামের যে ভাব ভক্তের প্রতি আছে, তেমন আমার ভাব পরমেশ্বরের প্রতি থাকা।
পীতবর্ণ — প্রত্যেক মানুষের আসল কান্ডারী (রক্ষক)
এই পীতবর্ণ আমাদের সঙ্গ কখনও ছাড়ে না। যখন দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যায়, তখন পঞ্চপ্রাণের সাথে সেই মানুষের অন্তর্মন আর লিঙ্গদেহ (সূক্ষ্ম শরীর) নিয়ে যায়। এই লিঙ্গদেহের রঙও হলুদই হয়। নতুন জন্মেও লিঙ্গদেহের সাথে এই রঙই থাকে। এইজন্যই হলুদ পীতাম্বর মানে আমাদের আসল কান্ডারী। আমার লিঙ্গদেহকেও নিরাপদে দেহের বাইরে নিয়ে যাওয়া, সেখান থেকে আবার নতুন জন্মে আমাকে নিয়ে আসা এই পীতবর্ণ, এই পরমেশ্বরের গায়ের বস্ত্রের রঙ হয়ে থাকা এই হলুদ রঙ, এই সম্পূর্ণ পৃথিবীকে শক্তি জোগানো এই সূর্যের উদয়ের রঙ হওয়া এই হলুদ বর্ণ এবং এইজন্যই আমার রামের ধ্যান করার সময় ‘পীতংবাসোবসানং’ মানে হলুদ বস্ত্র পরা রাম আমার চোখের সামনে আসা উচিত।

Comments
Post a Comment