প্রকৃতি – পরমেশ্বরেরই এক স্বরূপ
সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ বাপু রামরক্ষা স্তোত্রমন্ত্র মালিকার ৯ম প্রবচনে বলছেন, ২০০৫ এর নতুন বছর শুরু হচ্ছে কিন্তু আমরা যেমন আছি তেমনই আছি। রাতে শান্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে একটা শান্তি পাওয়া যায়। আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল আর পৃথিবী এই পঞ্চমহ ভূত দিয়ে তৈরি এই প্রকৃতিই হল এই সগুণ সাকার প্রকৃতি। সেই পরমাত্মাকে ডাকা আমরা আর আমাদের শব্দ এই পঞ্চমহ ভূত দিয়েই তৈরি।
প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক খুব কাছের। কিন্তু আমরা সেটা ভুলে যাই। এই প্রকৃতি মানে আমাদের সেই পরমাত্মার সাথে জোড়া আর সেই পরমাত্মাকে আমাদের সাথে জোড়া পরমেশ্বরেরই এক স্বরূপ, সেই পরমেশ্বরের এক দূত। আমরা সেই ভগবানের প্রার্থনা সবসময় সংকট এলেই একটা উদ্দেশ্য নিয়েই করি যে আমাকে বাঁচাও। তিনি আমাদের বাঁচাতে ছুটে আসেন ঠিকই, কিন্তু আমরাই তার উল্টো দিকে ছুট লাগাই। তখন যখন আমাদের এটা বোঝা মুশকিল হয়, তখনই আমাদের কষ্ট শুরু হয়।
ঘোরকষ্টোদ্ধরণ স্তোত্রের পাঠ মানেই অনিরুদ্ধাজ অ্যাকাডেমি অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট
বাপু বলছেন, ঘোরকষ্ট মানেই Disaster। আধ্যাত্মিক স্তরে যেটা ঘোরকষ্টোদ্ধরণ স্তোত্রের পাঠ, সেটাই আমাদের ব্যবহারিক স্তরে ‘অনিরুদ্ধাজ অ্যাকাডেমি অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’। সংকটে প্রকৃতির রুদ্র রূপ সামনে এলে এক মুহূর্তে যা ছিল তা সব শেষ হয়ে যায়। তখন আমাদের কেউ সাহায্যে আসে না। শুধু পরমেশ্বরের বরদহস্তই তা থেকে বাঁচাতে পারে। সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ বাপু প্রবচনে সুনামির উদাহরণ দিলেন। সমুদ্রতীরে আনন্দে খেলতে থাকা লক্ষ লক্ষ লোক এক মুহূর্তে নেই হয়ে গেল। সবাই হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু ঢেউ এল আর সব শেষ। বাঁচল তারাই, যাদের ওপর ঈশ্বরের বরদহস্ত ছিল।
কোনও জ্যোতিষীই এই ভবিষ্যৎবাণী করেননি। কিন্তু ত্রাণকর্তা ’যিনি আছেন’ তিনি দেখিয়ে দিলেন যে আমি এই সমুদ্রেরও অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তোমাদের আঙুল ধরতে তৈরি আছি, কিন্তু তোমরা আমার আঙুল ধরতে তৈরি হতে হবে। যদি আমরা তার আঙুল না ধরি, তবে কোনও ‘বোট’ আমাদের তরাতে পারবে না।
বাপু এগিয়ে বলছেন যে আমরা ’ঘোরাৎকষ্টৌদ্ধরাত্মান্নমস্তে’ বলি কিন্তু তেমন প্রত্যক্ষ কাজও আমার দিক থেকে হওয়া চাই। বেসিক ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের কোর্স (Aniruddha's Academy of Disaster Management) আমার করা উচিত। বিপদের সময় ভাবারও সময় থাকে না; প্রস্তুতি আগেই করে রাখতে হয়। অনেক সময় সংকট এলে ঈশ্বরকে দোষ দেওয়া মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল; ঈশ্বর অন্যায় করেননি। সংকটেও তিনি আমার সাথে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি আমাকে নিজের আঙুল ধরতে বলছেন। তাই তাকে দোষ দেওয়া থামিয়ে তার আঙুল ধরা উচিত।
নামস্মরণের সাথে কাজও জরুরি
নামস্মরণ জরুরি, কিন্তু সেটা প্রত্যক্ষ জীবনে কীভাবে নামাতে হবে সেটা জরুরি। জীবনের মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন, বস্ত্র) ভুলে নামস্মরণ করা অর্থাৎ খিদে পেলে অন্নের বদলে শুধু ভগবানের নাম নেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু, সংকটে পড়লে পরমেশ্বরকে আপনাআপনিই ডাক চলে যায়।
২০০৭ এর পরে ঘটা অনেক খারাপ ঘটনার বিষয়ে সদগুরু শ্রী অনিরুদ্ধ বাপু অনেকবার সাবধান করেছেন; এমন বড় ঘটনার জন্য নিজের প্রস্তুতি, সতর্কতা আর প্রয়াস জরুরি। বাপু বলছেন যে আমি এখানে আপনাদের ভালো লাগবে এমন কথা বলতে আসিনি, আপনাদের মনোরঞ্জনের জন্য আসিনি বরং আমাকে যা বলতে হবে এবং আপনাদের সতর্ক ও সুসজ্জিত করতে হবে তার জন্য আসি। রামরক্ষা, ঘোরকষ্টোদ্ধরণ স্তোত্র এর করা পাঠ গুরুপূর্ণিমার দিন বাপুর ‘ব্যাঙ্কে’ জমা করা উচিত মানে সময় পড়লে তার ওপর সুদ দেওয়াটা বাপু ভালোই জানেন। অনিরুদ্ধাজ অ্যাকাডেমি অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে প্রত্যেকে নিজেকে তৈরি করুন, যাতে বিপদ এলে সেদিন আমরা সিদ্ধ থাকব। যে মন থেকে ভক্তি আর সেবা করবে, সেই এমন কঠিন সময়ে টিকে থাকতে পারবে।
‘নবকমলদলস্পর্ধিনেত্রং প্রসন্নম’ – রামের চোখের প্রসন্নতা
পরে বাপু ধ্যানমন্ত্রের ’নবকমলদলস্পর্ধিনেত্রং প্রসন্নম’ এই শ্লোকের অর্থ বুঝিয়ে বললেন। এই রাজীবলোচন রামের চোখ সদ্য ফোটা পদ্মের পাপড়ির মতো প্রসন্নতা ও নতুন শক্তি দেওয়া। মানুষের চোখ কখনও মিথ্যে বলে না, তার ভেতরের ভাবনাগুলো সত্যি হয় আর ভক্তের জন্য রামের চোখে কখনও ক্রোধ দেখা যাবে না বা সেই চোখ ভক্তকে অশান্তি দেবে না। যদি কখনও ক্রোধ বেরোয়ও তবুও তা ভক্তদের প্রসন্ন করার মতোই হবে। মানুষের চোখ হল জ্ঞানেন্দ্রিয়, দৃশ্য সৃষ্টি দেখে তা থেকে জ্ঞান ভেতরে নেওয়া; কিন্তু একমাত্র এই রামের চোখ শুধু দেওয়ার। প্রসন্নতা, শান্তি দেওয়ার। লৌকিক দৃষ্টিতে রামের পাপড়ি বন্ধ হতে পারে কিন্তু এর চোখ কখনও বন্ধ হয় না আর এমন রামের আমাদের ধ্যান করতে হবে। ফোটা পদ্ম ভারতীয় সংস্কৃতিতে পবিত্রতার, প্রসন্নতার প্রতীক মানা হয়। আমার জীবন এমন ফোটা উচিত আর তার জন্যই বিশ্বামিত্রঋষি অর্থাৎ বুধকৌশিকঋষি আমাকে রামের ধ্যান করতে বলছেন।
ভগবান আমার আর আমি ভগবানের – ‘স্পর্ধিনেত্রং প্রসন্নম’
এই শ্লোকের পরের শব্দ হল ’স্পর্ধিনেত্রংপ্রসন্নম’। বাপু বলছেন যে এই স্পর্ধা (প্রতিযোগিতা) শব্দটা কিন্তু রামের জন্য নয় মানুষের জন্য। এই ভগবান যেমন আমার জন্য আছেন তেমনই আমিও এই ভগবানের জন্যই আছি। ভগবান আমার, তাহলে প্রথমে আমাকে ভগবানের হতে হবে, এটা সেই স্পর্ধা। আমার মনে থাকা রামের জন্য ভাব আর প্রত্যক্ষ রাম এর মধ্যেকার এই স্পর্ধা। প্রত্যক্ষ রাম অনন্ত, বিশাল। আমার মনের রাম আমি কীভাবে তৈরি করি তার ওপর সবকিছু নির্ভর করে। আমার মনে আমার পরমেশ্বরের প্রতি যে আমার ভক্তি, ভাব আছে, আমার মনে যে পরমেশ্বরের মূর্তি আমি তৈরি করেছি সেটা আমাকে বদলাতে হবে। মানে কী? যে পরমেশ্বর আমার ভালো করবেন কি না এমন চিন্তা না করে, ইনি আমার পরমেশ্বর, ইনি আমার আর আমি এঁর, ইনি আমার কল্যাণ করার জন্যই আছেন আর আমি আমার কল্যাণ করিয়ে নেবই। আমি আমার জীবনে অনেক সংকটের মুখোমুখি হব কিন্তু আমার বিশ্বাস থাকবে যে সংকটে আমার পেছনে, আমার আশেপাশে, আমার সামনে আমার ইনি দাঁড়িয়ে থাকবেনই, একশো আট শতাংশ থাকবেনই আর ইনি প্রেমময়। ইনি যতটা প্রেম করেন ততটা আমি এঁর ওপর প্রেম করতে পারছি না। এটা প্রথমে আমরা মেনে নিই আর আমাদের প্রেম আরও বাড়ানোর চেষ্টা করি। সব মানুষের ওপর পরমাত্মা সমান প্রেম করেন। এই প্রেম দেওয়ার সময় আমাদের জাত, ধর্ম, বড়লোকী বা আমি কত পাপী এর তার কাছে কোনও তফাত পড়ে না। তিনি প্রত্যেককে সুযোগ দিতে তৈরি আছেন। কিন্তু এই তার কৃপা নেওয়ার জন্য, এই সুযোগ স্বীকার করার জন্য আমাকে আমার মনের যে ভগবানের প্রতিমা আছে সেটা ঠিকঠাক সাকার করতে হবে; স্পর্ধিনেত্রংপ্রসন্নমে যে স্পর্ধা আছে সেই স্পর্ধা মানে খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প।
খরগোশ-কচ্ছপের গল্প – প্রয়াস আর প্রারব্ধ এদের স্পর্ধা
এরপরে বাপু আমাদের উপনিষদ থেকেই আসা গল্প খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প বললেন। খরগোশ মানে আমাদের পরমেশ্বর প্রাপ্ত করার প্রয়াস আর কচ্ছপ মানে আমাদের প্রারব্ধ। প্রয়াস আর প্রারব্ধ এদের স্পর্ধা আছে। প্রয়াস পরমেশ্বরকে সাক্ষী রেখেই হতে পারে আর কচ্ছপ হাঁটার (অর্থাৎ প্রারব্ধ) নিজের কাজ করতেই থাকে। আমাদের পরমেশ্বরকে সাক্ষী রেখে দৌড়তেই হবে, কিন্তু তার জন্য জরুরি কী? যে জাগ্রত থাকা। এই স্পর্ধা ঠিক করে যে জীবনে আমি প্রসন্নতা পাব কি না? যেই অর্থে আমি সংকটে আছি সেই অর্থে আমার খরগোশ ঘুমিয়ে পড়েছে আর আমার কচ্ছপ এগিয়ে যাচ্ছেই, কারণ ও যেতেই থাকে। আমরা ‘কূর্মগতি’ শব্দ কচ্ছপের গতির জন্য মানে প্রারব্ধের কূর্মের গতির জন্য ব্যবহার করি। এই কূর্মের পিঠেই অমৃতমন্থন হয়, যা থেকে বিষও বেরোয় আর অমৃতও বেরোয়। কিন্তু বিষ পান করার জন্য শিব প্রসন্ন থাকা দরকার আর অমৃত বাঁটার জন্য সেই বিষ্ণু প্রসন্ন থাকা দরকার। তাহলে বিষ্ণু আর শিবের একরূপ হওয়া যে হরিহর, ত্রিবিক্রম আছেন; সেই সদগুরু আমার জীবনে যদি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে আমার বিষের ভয় নেই আর অমৃতের জন্য লাচার হওয়ার দরকার নেই। তিনি আমাকে সবকিছু দিতে সমর্থ। আসল দৌড়ানোর ক্ষমতা খরগোশেরই বেশি। অর্থাৎ কী না মানুষের প্রয়াস, মানুষের পরিশ্রম প্রারব্ধের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কিন্তু, গতি বাড়িয়ে কোনও একটা ধাপে পৌঁছলে আমরা ঘুম দিই তাই সেই প্রারব্ধের কচ্ছপ আমাদের চেয়ে এগিয়ে যায় আর আমার পুরো জীবনকে গ্রাস করে এটা আমার বোঝা উচিত।
খরগোশকে (প্রয়াসকে) সর্বদা জাগ্রত ও প্রসন্ন রাখা - রাম
এই খরগোশকে সর্বদা জাগ্রত রাখা, আমাদের চনমনে রাখা এই রামই। আর যখন আমরা প্রসন্ন থাকি তখনই চনমনে থাকতে পারি। প্রসন্নতার জন্যই আমাদের শোকের নাশ হয়, আমাদের খেদের নাশ হয়, আমাদের আপসোসের নাশ হয়। আমাদের পরমেশ্বর মানবজন্ম দিয়েছেন মানে আমাদের পরিশ্রম, প্রয়াস খরগোশের। মানুষ ছাড়া বাকি সব প্রাণী কিন্তু ভোগযোনি। নিজেদের প্রারব্ধ বদলানোর জন্য তারা কোনও প্রয়াস করতে পারে না। কিন্তু আমরা প্রাণীর মতো আচরণ করি, আমরা জানোয়ারের মতো আচরণ করি তাই আমাদের ক্ষেত্রেও উল্টো হয়। আমাদের পরিশ্রম কচ্ছপের মতো থাকে আর আমাদের প্রারব্ধ খরগোশের গতিতে এগিয়ে যায়। এই স্পর্ধা উল্টো হওয়া উচিত। কচ্ছপকে যা হাঁটার তা ওর গতিতে হাঁটতে দিন কিন্তু খরগোশ যেন হাজার হাজার মাইল এগিয়েই যায়। যেখানে তুলনাই নেই এমন এই স্পর্ধা। কিন্তু কখন? যখন আমি রামের ধ্যান করব তখনই।
বাপু প্রবচনের শেষে বলছেন, "পরের শব্দটা সবথেকে সুন্দর, ’বামাস্কারূঢসীতামুখকমলমিলল্লোচনম’ এখানেও চোখের সম্পর্ক আছে আর ‘মুখকমল’ ও আছে। কিন্তু কার, তো সীতার। কারণ রামের প্রসন্নতা মানেই সীতা যে সারা জগতের ক্রিয়াশক্তি।" পরের প্রবচনে তিনি এই শ্লোকের সবিস্তার আলোচনা করবেনই।

Comments
Post a Comment