সকল রকমের সম্ভাব্য বিপদ থেকে উদ্ধার করে , নিজের কাছে টেনে নেন আমার সদগুরু অনিরুদ্ধ বাপু। — সাক্ষীবীরা বেনখলে, মাসকাট।

অন্য দেশ, অন্য মানুষ এবং অন্য ভাষা - এমন পরিস্থিতিতে এই ভক্ত পরিবারকে এমন এক ঘটনার সন্মুখীন হতে হয়, যেখানে মনে হয় যে সমস্ত পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের প্রায় দুই বছর বয়সী কন্যা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকা এক পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছে যায়। কিন্তু এমন সময়েও  সদগুরুর কৃপার কোনো বিলম্ব হয় না। এরপর যা ঘটে, তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। 
-------------------------------------------
হরি ওঁ, 
১৯৯৮ সালে আমরা বাপু পরিবারে যোগ দিয়েছিলাম। আমার স্বামী নেসলে কোম্পানিতে কাজ করেন এবং বিয়ের পর থেকে আমরা মাসকাটেই আছি। 

আমি এখানে আমার প্রায় দুই বছর বয়সী কন্যা মৃন্ময়ীর এক অনুভব সবাইকে বলব। সেই নিশ্চয়তা যা সাইবাবা স্বদেহে থাকাকালীন দিয়েছিলেন এবং এখানে আমি তা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছি।

মজ ন লাগে গাড়ি ঘোড়ী।
বিমান অথবা অগীনগাড়ী।
হাক মরি জো অবলম্বি।
প্রগটে মি তে ঘড়ী অবলম্বি।

আমার মা-বাবা ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার মাসকাটে এসেছিলেন। মা চাকরি করেন আর বাবা অবসরপ্রাপ্ত। মায়ের এক মাসের ছুটি থাকায় তারা এক মাসের মধ্যে আবার ভারত ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০ জানুয়ারির রাত্রি দেড়টার ফ্লাইট ছিল। আমাদের অবশ্যই তাদের বিমানবন্দরে পৌঁছাতে যাবার কথা ছিল। ওই দিন শুক্রবার ছিল এবং প্রতি শুক্রবার আমরা স্থানীয় উপাসনা কেন্দ্রে অশুভনাশিনী স্তবনম্ এবং শুভঙ্করা স্তবনম্ ২৭ বার পাঠ করতাম।

আমি মাসকাট থেকে ১৩৪ কিমি দূরে সুয়েট নামে একটি গ্রামে তখন থাকতাম। মাসকাট থেকে সুয়েট যাত্রা এক দেড় ঘণ্টার। মা-বাবার কিছু কেনাকাটাও বাকি থাকায় আমরা গাড়িতে সবাই একসাথে উপাসনা করি এবং কর্মকর্তার বাসায় বাপুর দর্শন করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে দেরি হয়ে যায় এবং তারা শুক্রবারের উপাসনার পর বাসা বন্ধ করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাপুর দর্শন না পেয়ে আমি কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম।

আমাকে স্বস্তি দিতে আমার স্বামী বলে ওঠেন, বাপু তো সর্বত্রই রয়েছেন। তুমি 
দূর থেকে তাঁর পায়ে নমস্কার করলেও, তিনি তোমার নমস্কার গ্রহণ করবেন। তিনি আমাদের সঙ্গে এখানেও আছেন।

অতঃপর দূর থেকে নমস্কার করে আমরা মলে কেনাকাটার জন্য বের হলাম এবং সেখান থেকে বিমানবন্দরে গিয়েছি। আমরা দুজনেই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মানে মা-বাবাকে ছেড়ে দিতে গিয়েছিলাম। আমার মেয়ের আমার মা-বাবার ওপর খুব টান ছিল। তাই আমরা তাদের সঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটালাম। 

শেষে মা নিজে বলতে, রাত ১ টায় আমরা ফেরার জন্য রওনা হলাম। তখন মৃন্ময়ী খুব রেগে গিয়েছিল। তাকে শান্ত করতে আমি সিকিউরিটির ভয় দেখালাম। এরা পুলিশ, বলতেই সে ভয়ে শান্ত হল।

ফেরার পথে মৃন্ময়ী খাবার খাচ্ছিল এবং গাড়িতে নাচছিল। আমরা ভাবছিলাম সে সব ভুলে গেছে। সে দুধ চাইছিল, খেয়েই শুয়ে পড়ল। বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৮ কিমি গিয়েই হঠাৎ ঘুমন্ত অবস্থায় মৃন্ময়ী কেমন যেন করে উঠল। ভাবলাম ও হয়তো স্বপ্ন দেখে ঘাবড়ে গেছে। আমি  তাই তাকে শাসিয়ে বললাম, শুয়ে থাকো তুমি এখন,ঘুমোও। তখন সে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমার বুক তখন হঠাৎ  ধড়ফড় করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখ যেন ওপরে উঠে গেল ও দেহ খিচুনি দিতে লাগল। সে প্রচণ্ড জ্বরে কেঁপে কেঁপে উঠল। 

আমি খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। স্বামীকে বললাম, মৃন্ময়ী কেমন চোখ ঘোরাচ্ছে দ্যাখো। তিনি বললেন, সে ঘুমিয়ে আছে। আমি বললাম, এটা কেমন যেন অন্য রকম লাগছে। মৃন্ময়ী কোন সাড়াশব্দ দিচ্ছিল না। আমি তখন গাড়ি থামাতে বললাম। ছোট মেয়ের জন্য গরম ও ঠাণ্ডা জল এবং ওর জন্য খাবার সব সময় সঙ্গে রাখা থাকত।

হঠাৎ লক্ষ করলাম যে মেয়ের তখন ফিটের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমার স্বামী তার মাথায় ঠাণ্ডা জলের ১.৫ লিটারের বোতল থেকে জল ঢেলে দিচ্ছিল। আমি তার পিঠ এবং বুক মুছিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আমার মনে হল, আমার মেয়ে বোধহয় এবার চলে যাবে। আমি তখন কাঁদতে লাগলাম।

মাসকাটে ওমানিরা থাকে এবং তারা আরবি ভাষায় কথা বলে। আমি জোরে চিৎকার করতে লাগলাম, কেউ সাহায্য করুন, আমার মেয়ে মরে যাচ্ছে। কিন্তু রাত ১.৩০ টায় কে আসবে আমাদের সাহায্য করতে? এখানকার সব মানুষগুলোই তো আমাদের অপরিচিত! আমার স্বামী আমাকে বললেন, আমরা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। আমরা গাড়িতে বসলাম এবং ঘোরকষ্টোদ্ধরণ স্তোত্র পড়তে শুরু করলাম।

কতবার স্তোত্র পাঠ করেছি, বাপুই জানেন। আমরা গাড়ি স্টার্ট দিতে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ সামনে একটি সাদা গাড়ি রিভার্সে এসে থামল। গাড়ি থেকে একজন কন্দুরা (ওমানি পোশাক) পরা লোক নামল। যেন কত দিনের পুরোনো পরিচয়। সে বলল,
আমি দত্ত ( দত্তাত্রেয়) , আমি দত্ত ( দত্তাত্রেয়), এমনটা একবার নয়, দু দুবার শুনতে পেলাম। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, কি করে এই ওমানী মানুষ মারাঠি ভাষায় বলছিল, আমি দত্ত ( দত্তাত্রেয়) 
আমাদের মেয়েটিকে তার হাতে তুলে দিলাম, আর সেইসঙ্গে তার চেতনা ফিরতে শুরু করল। সে চোখ খুলল, চারদিকে তাকাল। আমি বললাম, আমার মেয়ে আপনার হাতে গিয়ে বেঁচে গেল। সে বলল,
I am a doctor. Your baby is fine. Dont take tension.
পরে তিনি বললেন আমাকে, মৃন্ময়ীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আমার স্বামী গেলেন তার কাছে। সে শুধু ঘুরে তাকাল এবং পুনরায় যা ইংরেজিতে বলল, তা স্বামীকে মারাঠি তেও বলতে শোনা গেল। আমরা দুজনই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।

আমরা বুঝতে পারলাম, এটি বাপুরই ব্যবস্থা। আমরা তার পরিচয় বা গাড়ি কোথায় গেল তা জানতেও পারি নি। পরে সে পুলিশের গাড়িকে থামিয়ে বলল, এরা খুব দুঃশ্চিন্তায় আছে তাই কাছাকাছি কোন হাসপাতালের ঠিকানা দিন। আমরা ঠিকানা নিলাম। কিন্তু রাস্তা খারাপ এবং অনেক ডাইভার্জন থাকার কারণে হাসপাতালে পৌঁছানো সহজ ছিল না।

মেয়ের সুস্থ হওয়ায় আমরা আনন্দিত ছিলাম, কিন্তু মনে ছিল—যে নির্দেশ তিনি দিলেন, তা পালন করা প্রয়োজন। পরবর্তীতে, হাসপাতাল একটা দেখলাম, কিন্তু তা বন্ধ ছিল। মৃন্ময়ী ক্লান্ত ছিল ও তখনও মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে রাখছিল।

আমার স্বামী সকালে মলের পাশে একটি নতুন হাসপাতাল দেখেছিলেন। রাতেই সেই হাসপাতালের কথা মনে পড়ে গেল। প্রায় পৌনে দুই থেকে দুটোর মধ্যে আমরা হাসপাতাল পৌঁছলাম। জরুরি বিভাগে ভর্তি করানো হলো। সমস্ত পরীক্ষা করা হলো। রিপোর্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তার জ্বরও নেমে গেছে।

এটি সত্যিই তিন সত্যির মতই এক সত্যি। আমি বিশ্বাস করি, বাপুই এই সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন, যেন তাঁর ভক্তকে সকল রকম বিপদ থেকে উদ্ধার করা যায়।
হরি ওঁ শ্রীরাম অম্বজ্ঞ নাথসম্বিধ।

Comments