এবং এখানে মল্লাররাওয়ের গ্রামে অর্থাৎ ধারপুরে মল্লাররাওয়ের কাজ জোরকদমে, একেবারে দিনের আলোয় চলছিল এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত ঠিকঠাক সম্পন্নও হয়েছিল। সমস্ত সামগ্রী অর্থাৎ পিস্তল, ছোট বন্দুক, কার্তুজ (Cartridge) এবং অন্যান্য কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী গরুর গাড়িতে পুণের দিকে অনেক আগেই রওনা করে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি গরুর গাড়ির চালক ছিলেন এক একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী।
এটা আজকের কথা ছিল না। 1928 সাল থেকে মল্লাররাও এইরকম পরিকল্পনা করে কাজ করে নিজের এমন একটি ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অন্যদিকে প্রতিদিন মল্লাররাওয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে কমপক্ষে একশো গরুর গাড়ি তো কোনো না কোনো সামগ্রী নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত যেত। সেই গরুর গাড়ি পরীক্ষা করে-করে ব্রিটিশ অফিসার, ব্রিটিশ সার্জেন্ট, ভারতীয় সিপাহীরাও বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং মল্লাররাওয়ের সীলমোহরের কাগজ দেখলেই সেই গরুর গাড়িগুলোর দিকে কেউ ফিরেও দেখত না।
সবচেয়ে বাজে কাজ ছিল মল্লাররাওয়ের গরুর গাড়িতে অনেক সময় জ্বালানির কয়লা, বালি, নুড়ি, মুরম মাটি, জাম্বে পাথর, নুড়ি (ছোট ছোট টুকরো করা পাথর), গোবরের ঘুটে (গোবর্যা) র মতো জিনিসও ঠাসাঠাসি করে পাঠানো হতো। আর প্রধানত সেই সব মালপত্রের সঙ্গে মাঝে মাঝে জঙ্গলে পাওয়া নানা ধরনের আঠা (ডিঙ্ক) থাকত। আর এই সবের গন্ধ এবং ধুলো, ব্রিটিশদের কেন, ভারতীয় অফিসার এবং সিপাহীদেরও অসহ্য লাগত। এর সঙ্গে কিছু সময় পশুর প্রক্রিয়াজাত চামড়াও থাকত এবং নুন দিয়ে শুকনো করা নানা ধরনের মাছও থাকত। নোনা মাছের, প্রক্রিয়াজাত চামড়ার এবং আঠার গন্ধ পেলেই ব্রিটিশ অফিসার এবং সার্জেন্টরা, সেই গাড়িগুলো থেকে আক্ষরিক অর্থে দূরে পালাতেন।
তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সিপাহীদের, 'স্বাধীনতার লড়াই কিসের জন্য এবং কী' এতটুকু জানারও বুদ্ধি ছিল না। এমন বেশিরভাগ লোকই অশিক্ষিত বা একেবারেই অল্প শিক্ষিত থাকত। ব্রিটিশদের উপর রাগ থাকত, কিন্তু পেটের জন্য এবং মজার জন্য এই চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের ব্রিটিশ অফিসারদের খুশি রাখতেই হতো এবং সেই জন্য এই ভারতীয় সিপাহীরা সন্দেহভাজন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মারধর করার পিছনে একদম তৎপর থাকত।
মল্লাররাও রামচন্দ্রের সাথে ভালোভাবে কথা বলে এমন অনেক ভারতীয় সিপাহীকে নিজেদের সঙ্গে শক্তভাবে বেঁধে নিয়েছিলেন।
প্রধানত, বৃদ্ধ এবং মধ্যবয়সী নারীদেরও মল্লাররাও এই কাজে যুক্ত করেছিলেন। তারাও ওয়ারকরী-দের আদর্শ সামনে রেখেই - একদম নামকরা প্রতিপত্তিশালী বাড়ির মহিলাদের থেকে শুরু করে অশিক্ষিত মহিলাদের পর্যন্ত বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মহিলাদের রামচন্দ্রের স্ত্রী অর্থাৎ জানকীবাই নিজে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
এমন বৃদ্ধ পুরুষ, সাধারণ দেখতে মজুর এবং এই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মহিলাদের দেখে, ব্রিটিশ অফিসাররা এমন গরুর গাড়িগুলোর পিছনে পড়তোই না। কারণ অকারণে কোনো বুড়ো মানুষ মারা গেলে বা কোনো উচ্চ ঘরের মহিলা অপমানিত হলে, পুরো সমাজ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যেতে পারত এবং এমন পরিস্থিতি যাতে না হয় তার জন্য সমস্ত ব্রিটিশ অফিসারদের বারবার ওপর থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হত। এই কারণে মল্লাররাও এবং রামচন্দ্রের কাজ একদম মসৃণভাবে চলত।
তার উপরে মল্লাররাও ছিলেন খুব ধার্মিক। তাঁকে ব্রিটিশ অফিসাররা চিনতেন, 'সবসময় দেব-দেব করা অতি ধনী জমিদার' হিসাবেই। এই ব্রিটিশ অফিসাররা নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় মল্লাররাওকে, 'চালু বুড়ো' (বনেল ম্হাতারা) সবরকমের পাপ করে স্বর্গে যাওয়ার জন্য দেব-দেব করে, এমন বলত। কারণ ছিল দুটি।
মল্লাররাও বিভিন্ন জায়গার, একদম ছোট ছোট গ্রামেরও মন্দিরগুলোকে জীর্ণ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতেন এবং সবসময় কোনো না কোনো মন্দিরে যেতেন ও প্রচুর দান-ধর্ম করতেন। পাশাপাশি অনেক মন্দিরের পাশে তিনি কুয়ো এবং ছোট ছোট ধর্মশালাও নির্মাণ করেছিলেন।
আবার অন্যদিকে, প্রতিটি মেলার তামাশার (লোকনৃত্য ও নাটকের) মঞ্চে হাজিরা দিতে মল্লাররাওয়ের ভুল হতো না এবং তাঁর বাড়িতেও লাবণীর অনুষ্ঠান হতো। তাও প্রকাশ্যে এবং অনেকবার।
আসলে মল্লাররাওয়ের এমন অনুষ্ঠানে সামান্যতমও আগ্রহও ছিল না, কিন্তু রসিকতার নাটক করা আবশ্যক ছিল। লোলুপ ব্রিটিশ অফিসারদের নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে উৎসাহিত করার জন্যই এমন জিনিসগুলো দরকারি ছিল।
জানকীবাইয়ের বয়স মাত্র একুশ বছর ছিল, কিন্তু সেই সময়ের লোকেদের তাঁর প্রতি কৌতূহল ছিল কারণ তিনি সাবলীল ভাবে (Fluent) ইংলিশ বলতেন। গভর্নরের স্ত্রী জানকীবাইয়ের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। এই বৃটিশ গভর্নরের স্ত্রী কোনো অনুষ্ঠানে জানকীবাই ছাড়া যেতেনই না।
কিন্তু গোটা গ্রামের ভালোভাবে জানা ছিল যে এই গুদামের ঠিক সামনেই মল্লাররাও দ্বারা জীর্ণ অবস্থা থেকে উদ্ধার করা (আসলে তৈরি করা, নির্মাণ করা) 'ধারপুরেশ্বর মহাদেব'-এর মন্দির ছিল। এবং যার মধ্যে শিবলিঙ্গের পাশাপাশি ত্রিবিক্রমের 'হরিহর' স্বরূপের মূর্তিও ছিল।
(গল্পটি চলছে)

.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
Comments
Post a Comment