“বাল গঙ্গাধর তিলক ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ছিলেন। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন এবং সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
বাল গঙ্গাধর তিলক যখন ১৬ বছর বয়সের ছিলেন, তখন তাঁর পিতা গঙ্গাধর তিলক সামান্য অসুস্থতার কারণে ১৮৭২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময় তিলকের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর, এবং তাঁর বিবাহও হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীর পিতৃগৃহের নাম ছিল ‘তাপীবাই’ এবং শ্বশুরগৃহের নাম ছিল ‘সত্যভামাবাই’।
লোকমান্যের বিবাহের পর মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই গঙ্গাধররাও তিলকের মৃত্যু হয়। এর ফলে তাঁর কিছু আত্মীয়-স্বজন এবং গ্রামের লোকজন সত্যভামাবাইকেই দোষারোপ করতে শুরু করে। তাঁদের ধারণা ছিল, তিলকের ঘরে বিয়ের পর তাঁর আগমনের কারণে অশুভ ঘটনা ঘটেছে, আর সেই কারণেই এক বছরের মধ্যেই শ্বশুরের মৃত্যু হয়েছে। সেই সময়ে এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা সমগ্র ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়া নারীদের ‘মনহুস’ (অর্থাৎ যার আগমনে অমঙ্গল ঘটে), অশুভসূচক, কুলক্ষণা বা অমঙ্গল বয়ে আনে, এইসব বলে তাদের অপমান করা হতো।
লোকমান্যের কাছে এই বিষয়টি বিশেষভাবে ধরা পড়ে তাঁর পিতার তেরো দিনের শ্রাদ্ধের কাজ চলাকালীন। কারণ সেদিন যখন সত্যভামাবাই খাবার পরিবেশন করতে আসেন, তখন কেউই তাঁর হাত থেকে কোনো খাবার নিজেদের থালায় নিতে চাইছিল না। অথচ একই খাবার অন্য কোনো মহিলা পরিবেশন করতে এলে, সবাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর হাত থেকে তা গ্রহণ করছিল।
লোকমান্য নিজেও সেদিন ভোজনের সারিতে বসেছিলেন, কারণ মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের তেরো দিনের শ্রাদ্ধভোজে উপস্থিত থাকা আবশ্যক ছিল। সেই ব্যক্তিই প্রথম গ্রাস গ্রহণ করার পরেই অন্যরা খাওয়া শুরু করতেন। লোকমান্যের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সত্যভামাবাইয়ের অসহায় অবস্থা ধরা পড়ে। কিন্তু একদিকে তাঁর নিজের বয়স তখন খুবই কম, আর অন্যদিকে এই ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। তাই তিলকজি কাউকে আঘাত না দিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে এই পরিস্থিতির সমাধান করেন।
লোকমান্য বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাত্র ১৪ বছরের সত্যভামাবাইকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেন এবং বড়া পরিবেশন করতে আসার ইঙ্গিত করেন। তিনি যখন বড়া পরিবেশন করতে এগিয়ে আসেন, তখন তিলকজি সম্পূর্ণ শান্তভাবে নিজের পাতের থালায় পাঁচ-ছয়টি বড়া তুলে নেন আর সেটাও সত্যভামাবাইয়ের হাত থেকেই।
প্রথমে তিনি খুবই ভীত ছিলেন, তাঁর হাত কাঁপছিল। কিন্তু বাল গঙ্গাধর তিলক অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে ভোজনরত সকলের সামনে বললেন, “আমি অকারণ ভুল ধারণা ও অন্ধবিশ্বাসকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিই না। আমাদের বিবাহ ঠিক হওয়ার আগেই আমার পিতা অসুস্থ ছিলেন। আপনার গৃহপ্রবেশের কারণে কোনো অমঙ্গল ঘটেনি।”
বাল গঙ্গাধর তিলকের এই কথাগুলি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করার পর, আরও কিছু সমমনা মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যভামাবাইয়ের কাছ থেকে যেচে বড়া নেন। তাঁর দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং চিন্তার স্বচ্ছতার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, আর কেউ কোনো আপত্তি তোলার সাহস করতে পারেনি।
সেই রাতে বন্ধুদের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাল গঙ্গাধর তিলককে তাঁর বন্ধুরা কথার ছলে বুঝিয়ে বললেন, “বাল! তোমার দৃঢ় মুখভঙ্গি, তোমার জোরালো কণ্ঠস্বর এবং চিন্তার স্বচ্ছতার সামনে একেবারে একগুঁয়ে ও রক্ষণশীল বিরোধীরাও চুপ হয়ে গিয়েছিল। তুমি ভবিষ্যতে বড় নেতা হতে পারো।”
তিলকজি এই কথা শুনে শুধু মৃদু হাসলেন এবং বললেন, “এতটুকু ছোট ঘটনার জন্যই তোমরা আমাকে একেবারে ভারতের নেতা বানিয়ে দিলে! আমি তো এই গ্রামের সামান্য এক ম্যাট্রিক পাস করা ছেলে।”
ঠিক সেই সময় বাল গঙ্গাধর তিলকের কাঁধে হাত রেখে তাঁর প্রশংসা করে তাঁর পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এলেন তাঁর শিক্ষক চিন্তামণি বরভে এবং বললেন, “বাল! তোমার এই বন্ধুদের কথা একেবারেই সত্য। এই ঘটনাটি যখন ঘটেছিল, তখন আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি গত ২৫ বছর ধরে রত্নাগিরি জেলার প্রধান বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাদান করছি এবং গত দুই বছর ধরে নিজেই এই গ্রামে এসে রয়েছি।”
বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন স্বভাব ও স্পষ্ট চিন্তাধারার কোনো ছাত্র, শিক্ষক বা প্রৌঢ় নাগরিক আমি দেখিনি। মানুষ ঘরের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক করে; কিন্তু কোনো মতাদর্শগত বিষয়ে দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান রেখে সবার বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস তোমাকে ছাড়া অন্য কারও মধ্যে আমি দেখতে পাইনি।
“বাল! তুমি সত্যিই ভারতের ভাগ্যনির্মাতা হতে পারো। আমি আন্তরিকভাবে বলছি, তুমি রত্নাগিরি ছেড়ে পুনে অথবা মুম্বাইয়ে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করো।”
এই ব্রিটিশ কলেজগুলোতে পড়াশোনা করার সময় বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনার সম্পর্কে জানা যায়, ফলে আমাদের অভিজ্ঞতার পরিসর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে।
এছাড়াও এই ইংরেজি কলেজগুলোতে বড় বড় গ্রন্থাগার (Libraries) রয়েছে। সেখানে থাকা বইগুলো নাকি বিশ্বজোড়া জ্ঞান দেয়, এমনটাই আমি শুনেছি। তুমি এই গ্রন্থগুলোর অধ্যয়ন করে তোমার এই আত্মসম্মানবোধপূর্ণ মনোভাবকে আরও পরিপক্ব করে তুলতে পারো।
ব্রিটিশরা ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, রাওসাহেব পেশোয়া আর তাঁতিয়া টোপির সঙ্গে কী আচরণ করেছিল, তুমি তো সেই ইতিহাস জানোই। গত দুই বছর ধরে আমিই তো তোমাদের ছাত্রদের পড়িয়েছি।
ব্রিটিশরা ভারতকে আক্ষরিক অর্থেই লুট করছে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকেও ধ্বংস করছে। তোমার মতো একজন নেতার ভারতবাসীর অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের রাজা-মহারাজারা সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই সন্তুষ্ট থেকে নিজেদের ব্রিটিশ ভাবতে শুরু করেছেন।
তবে মনে রেখো, তাঁতিয়া টোপিকে কীভাবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, মঙ্গল পাণ্ডেরও একই দশা হয়েছিল আর বীরাঙ্গনা রানি লক্ষ্মীবাঈকেও ছলনা ও কৌশলে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর ব্রিটিশ সরকার প্রতিশোধের মানসিকতা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন জেলায় বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল।
এই কারণে তুমি তোমার পথ খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করবে, কারণ ব্রিটিশদের শাসন এখন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”
বরভে মাস্টার আর বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর বাল গঙ্গাধর তিলক একা আঙিনায় বসে ভাবতে লাগলেন। বরভে মাস্টারের কথা তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল এবং নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে তাঁর মাথায় অনেক চিন্তাভাবনা দানা বাঁধতে শুরু করল। আসলে তিলকের মনেও গত এক-দু বছর ধরে এমন সব চিন্তা বারবার আসছিল।
সারা রাত তিলক জেগে ছিলেন। তিনি পুনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ১৮৭৩ সালে তিনি পুনের ডেকান কলেজের ছাত্র হলেন। সেখান থেকেই তিনি ‘বি.এ. ম্যাথমেটিক্স’ (ফার্স্ট ক্লাস) ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিলক ডিগ্রির জন্য গণিত নিয়ে পড়াশোনা তো করছিলেনই, কিন্তু ডেকান কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে বসে পলিটিক্স (Politics), ফিলোসফি (Philosophy) পড়ার পাশাপাশি সংস্কৃত গ্রন্থগুলোরও গভীরভাবে অধ্যয়ন চালিয়ে যান।
১৮৭৭ সালেই বাল গঙ্গাধর তিলক এম.এ.-তে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। অধ্যয়নের শেষে তাঁর একটি দৃঢ় মত গড়ে ওঠে, ‘ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা ও ব্যবহারিক জীবন এগুলিকে একেবারেই আলাদা করা যায় না। শুধু আত্মকেন্দ্রিকভাবে জীবনযাপন না করে নিজের দেশকেই নিজের পরিবার হিসেবে মনে করা প্রয়োজন, আর সেই সময় এটাই ছিল সবচেয়ে জরুরি। দেশসেবার পরের ধাপ হলো মানবতা অর্থাৎ দীন-দুঃখীদের সেবা; আর সর্বোচ্চ ধাপ হলো ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, দেশসেবা ও মানবসেবা এই সব পথ অনুসরণ করতে করতে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন
বাল গঙ্গাধর তিলক ব্রিটিশ অধ্যাপক ও অন্যান্য ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আচরণ দেখে রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি এম.এ.-এর পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে মুম্বাইয়ের ‘গভর্নমেন্ট ল’ কলেজ’-এ ভর্তি হন।
(কথ চলবে)



Comments
Post a Comment