"তিনি সর্বদা আমাদের রক্ষা করেন এবং পরম মুক্তির পথ দেখান।" — স্নেহাবীরা গাভাডে, সান্তাক্রুজ।

"তিনি সর্বদা আমাদের রক্ষা করেন এবং পরম মুক্তির পথ দেখান।"  — স্নেহাবীরা গাভাডে, সান্তাক্রুজ।

বাপু বলেন, সদ্‌গুরুর তত্ত্ব শুধু তোমার পেছনেই নয়, তোমার চারদিকেই সদা সুরক্ষাকবচ হয়ে বিরাজমান থাকে। বাপুভক্ত শ্রদ্ধাবানরা বারবার তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতির সত্যতা উপলব্ধি করেছেন। একজন ভক্ত একবার সদ্‌গুরুকে নিজের সর্বস্ব বলে মেনে নিয়ে তাঁর প্রতি অটল বিশ্বাস স্থাপন করলে, পরে সে যতই ভুল করুক বা পথভ্রষ্ট হোক না কেন, সেই সদ্‌গুরুর তত্ত্ব তাকে কখনও বিপদের মুখে একা ফেলে দেয় না। বরং সর্বদা তাকে চারদিক থেকে আগলে রাখে, রক্ষা করে এবং সঠিক পথের দিশা দেখায়।

আমি এবং আমার স্বামী রাজনসিংহ ২০০৮ সাল থেকে বাপু পরিবারের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাপুর স্নেহময় ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার পর ধীরে ধীরে আমাদের জীবন এক সুন্দর ও সার্থক রূপ লাভ করতে শুরু করে। একের পর এক বাপুর কৃপাময় অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে আসতে থাকে। সেই সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই ভক্তি আরও গভীর হয়েছে এবং সদ্‌গুরুর শ্রীচরণের প্রতি আমাদের প্রেম ও সমর্পণ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই রকমই একটি কৃপাময় অভিজ্ঞতা আজ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি।

সবার আগে আমি বাপুর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে চাই। যেদিন এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল, সেদিন প্রকৃতপক্ষে আপনি আমাকে উপাসনা কেন্দ্রে আরতির সৌভাগ্য দিয়েছিলেন। তবুও আমি সেদিন উপাসনায় না গিয়ে একগুঁয়েমি করে দাদর চলে গিয়েছিলাম। আসলে তার আগের শনিবার, অর্থাৎ ২৩ জানুয়ারি ২০১৬-তে, উপাসনা কেন্দ্রের কর্মীরা আমাকে জানিয়েছিলেন যে পরের শনিবার আমার আরতির সুযোগ হবে। এই সংবাদ শুনে আমার মন আনন্দে ভরে উঠেছিল।

আরতির দিন, অর্থাৎ পরের শনিবার ৩০ জানুয়ারি, আমরা ঠিক করেছিলাম যে সন্ধ্যা ৫টার মধ্যে উপাসনা কেন্দ্রে পৌঁছে যাব, যাতে আগাম প্রস্তুতিতে অংশ নিতে পারি। সেদিনই আমরা যে আবাসনে থাকি সেখানে সত্যনারায়ণ পূজা ও ভাণ্ডারারও আয়োজন ছিল। উপাসনা কেন্দ্রে সেবায় যোগ দেওয়ার জন্য আমার স্বামী রাজনসিংহ ডিউটি থেকে সরাসরি বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। তিনি বললেন, "চলো, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে উপাসনায় যাই।" কিন্তু এত কিছু আগে থেকেই ঠিক হয়ে থাকা সত্ত্বেও, হঠাৎ আমার কী যে হলো, আমি নিজেও জানি না! আমি স্বামীকে বললাম, "চলো, আগে দাদরে কেনাকাটা করতে যাই।" রাজনসিংহ আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বললেন, "আরে, আজ তো তুমি উপাসনা কেন্দ্রে বাপুর আরতির সৌভাগ্য পেয়েছ। এমন কেন করছ? চল, আমরা উপাসনাতেই যাই। 

কিন্তু সেদিন আমার কী হয়েছিল, আজও আমি বুঝে উঠতে পারি না। আমি একরকম জেদ ধরেই বসেছিলাম যে দাদরেই যাব। শেষ পর্যন্ত আমার জেদের কাছে হার মেনে আমার স্বামী বললেন, "চলো, দাদরেই যাই।" তারপর আমরা স্কুটারে করে দাদরে গেলাম।

সেখানে প্রথমে আক্কলকোট স্বামীর মঠে গিয়ে দর্শন করলাম এবং সন্ধ্যা ৭টার আরতির জন্য অপেক্ষা করলাম। পাঁচটি আরতি শেষ হওয়ার পর আমরা মঠ থেকে বেরিয়ে এলাম। কাছেই একটি বড়াপাও গাড়িতে বাপুর একটি ছবি দেখতে পেলাম। আমি রাজনসিংহকে বললাম, "দেখো, বাপু!" তারপর কাছেই অবস্থিত বিঠ্ঠল মন্দিরে গেলাম। সেখানে গিয়েও দেখি আরতি চলছে। তাই বাইরে থেকেই দর্শন করে নিলাম। এরপর সবজি, ফুল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে স্কুটারে বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হলাম। পথে আবার একটি দোকানে বাপুর দর্শন পেলাম। আমি স্বামীকে বললাম, "দেখো, আজ বারবার বাপুর দর্শন হচ্ছে!" এ কথা বলার পর কেন জানি না, আমার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো। উপাসনা কেন্দ্রের আরতি না করে দাদরে এলেও, দু'দু'টি মঠ ও মন্দিরে এসে আরতিরই সম্মুখীন হয়েছি। তখন ধীরে ধীরে মনে অনুশোচনা হতে লাগল যে, উপাসনা কেন্দ্রের আরতিতে না যাওয়াটা আমার বড় ভুল হয়েছে।

আরও কিছুটা পথ এগোতেই আবার একটি গাড়িতে বাপুর ছবি চোখে পড়ল। আমি স্বামীকে বললাম, “আজ বারবার বাপুর দর্শন হচ্ছে।” তখন মনে হলো, যেন বাপু আমাদের কিছু বলতে চাইছেন। উপাসনায় না যাওয়ার অনুশোচনা আরও গভীর হতে লাগল। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, “বাপু, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আর কখনও এমন ভুল করব না।” স্কুটারে করে আমরা নির্বিঘ্নে কালানগর পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। এরপর রাত প্রায় ৯টার সময় কালানগর ব্রিজ নেমে খেরওয়াড়ি ব্রিজের দিকে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময় বান্দ্রা কোর্টের দিক থেকে খেরওয়াড়ি ব্রিজের রাস্তায় একটি সাদা রঙের গাড়ি পিছন দিক থেকে দ্রুত আমাদের দিকে আসতে দেখা গেল। রাজনসিংহও স্কুটারের আয়নায় সেটি দেখতে পেয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম, গাড়িটি সোজা চলে যাবে। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই সেটি প্রবল বেগে আমাদের স্কুটারে ধাক্কা মারল! তারপর কী ঘটেছিল, আমি যেন কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু শেষ মুহূর্তে মনে আছে, গাড়িটি একেবারে আমাদের গায়ের কাছে চলে এসেছিল। এরপর অনুভব করলাম, আমি রাস্তার উপর দিয়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত ঘষটাতে ঘষটাতে যাচ্ছি, আর আমার মুখ পুরো রাস্তার সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। দেখলাম, রাজনসিংহও স্কুটারসহ ডিভাইডারের দিকে ছিটকে চলে যাচ্ছেন। তখনই বুঝতে পারলাম, আমাদের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ যেন অন্ধকার হয়ে গেল। কেউ একজন আমার হাত ধরে আমাকে উঠিয়ে দিল। আমার মুখে, হাতে এবং পায়ে তীব্র ব্যথা হচ্ছিল। অথচ সেই অবস্থাতেও ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে নিজের কর্তব্য পালন করতে রাজনসিংহ সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে লেগে গেলেন। হঠাৎ আমার চোখ তাঁর পায়ের দিকে পড়তেই দেখলাম, তাঁর প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। আমার বুক কেঁপে উঠল। কারণ, এর মাত্র এক মাস আগে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই তাঁর একটি দুর্ঘটনা হয়েছিল। তখন তাঁর বাঁ পায়ে মারাত্মক আঘাত লেগেছিল, আর সবে সেই ক্ষত সেরে উঠেছিল। আমি ব্যাকুল হয়ে বাপুকে ডেকে বললাম, “বাপু, এ কী হলো! ওঁর প্যান্ট তো ছিঁড়ে গেছে। আবার কি বাঁ পায়েই আঘাত লাগল?” শেষ পর্যন্ত আশপাশে জড়ো হওয়া মানুষদের সাহায্যে আমরা দু'জনে একে অপরকে সামলে নিয়ে স্কুটারেই বাড়ি ফিরে এলাম।

বাপুর অসীম কৃপায় আমাদের স্কুটারের তেমন কোনো বড় ক্ষতি হয়নি। বাড়ি ফিরে আমরা আমাদের সন্তানদের পুরো ঘটনাটি জানালাম। ওরা দু'জনেই এ.এ.ডি.এম. (অনিরুদ্ধ'স অ্যাকাডেমি অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট)-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের প্রাথমিক চিকিৎসা করে।

আমাদের বসার ঘরের সামনেই বাপুর একটি ছবি রয়েছে। আমরা দু'জনে সেই ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাপুর মুখের দিকে তাকাতেই চোখ ভরে এল অশ্রুতে। মনে হচ্ছিল, ভয়ংকর সেই দুর্ঘটনা যেন আমাদের মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকে একমাত্র বাপুর কৃপাই আমাদের ফিরিয়ে এনেছে। আমরা আবেগভরে বললাম, "আই লাভ ইউ, মাই ড্যাড।"

এর আগের বৃহস্পতিবারই পিতৃবচনে বাপু বলেছিলেন, মোটরবাইকের পিছনে বসা আরোহীরও অবশ্যই হেলমেট পরা উচিত। আমি যদি বাপুর সেই উপদেশ মেনে চলতাম, তাহলে আমার মুখে এই আঘাত লাগত না। আর আমার স্বামী হেলমেট পরেছিলেন বলেই তাঁর মাথা ও মুখ সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল।

"আনন্দের এই মহাসমুদ্র | প্রেম কৃপা অপরিসীম |

করব রক্ষা নিরন্তর | পরম মুক্তি দেখাই অসীম ॥”

এই সত্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমরা সেই দিন লাভ করলাম। 

সবকিছু শান্ত হওয়ার পর হঠাৎ আমার মনে হলো—এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল হাইওয়ের মতো ব্যস্ত রাস্তায়। আমরা দু'জন স্কুটার থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। তবুও বাপুর সেই বাণী—"আমি শুধু তোমার পিছনে নই, তোমার সামনেও সর্বদা দাঁড়িয়ে আছি"—সেদিন যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠেছিল। মনে হলো, বাপুই আমাদের সামনে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাই পিছন থেকে ধাক্কা খাওয়ার পরও আর কোনো গাড়ি আমাদের ওপর উঠে আসেনি। চারদিক থেকেই আমরা অলৌকিকভাবে সুরক্ষিত ছিলাম। বাপু আমাদের এমন এক ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করলেন, যা মুহূর্তেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারত। প্রাণসংকটকে তিনি শুধু কয়েকটি আঁচড় ও সামান্য আঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন। তখন আমরা তাঁর অকারণ করুণা এবং নিঃস্বার্থ, নিঃশর্ত ভালোবাসার অপার মহিমা গভীরভাবে অনুভব করলাম। হে বাপু, আজ পর্যন্ত তুমি আমাদের অসংখ্যবার আর্থিক ও শারীরিক সংকট থেকে রক্ষা করেছ। আর আজ তুমি আমাদের মৃত্যুর দুয়ার থেকেও ফিরিয়ে এনেছ। অম্বজ্ঞ বাপু! আমাদের তুমি জীবনে আরও অনেক সেবা ও ভক্তি করার সুযোগ দাও। তোমার শ্রীচরণে আমরা যেন চিরকাল কৃতজ্ঞ, নিবেদিত ও অম্বজ্ঞ হয়ে থাকতে পারি।

Hindi English


Comments