অসম্ভবকে সম্ভবকারী বাপু — সঞ্জয়সিংহ জাধব, রেন্দাল, কোলহাপুর

অসম্ভবকে সম্ভবকারী বাপু  — সঞ্জয়সিংহ জাধব, রেন্দাল, কোলহাপুর

আমি ১৯৯৬ সালে কোলহাপুর জেলার রেন্দাল থেকে চাকরির সন্ধানে মুম্বইয়ে গিয়েছিলাম। সেই সময়ই আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে পরমপূজ্য সদ্গুরু শ্রী অনিরুদ্ধ বাপু সম্পর্কে জানতে পারি।

২০০৩ সাল পর্যন্ত আমি মুম্বইয়েই ছিলাম। এরপর পরিবারের সকলের অনুরোধে আমি আবার রেন্দালে ফিরে আসি। রেন্দালে ফিরে আসার পর এখানকার এক সুপরিচিত শিল্পপতির প্রতিষ্ঠানে আমি কাজে যোগ দিই। পেট্রোল পাম্প, হোটেল ব্যবসা, সোনা-রুপোয় বিনিয়োগ, এমন নানা ধরনের ব্যবসা রয়েছে তাঁর। আমার কাজের দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ লক্ষ্য করে মালিক ধীরে ধীরে আমার ওপর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করতে শুরু করেন। আর ঠিক এর পরেই যেন আমার জীবনে সেই ভয়াবহ ঘটনাটি নেমে এল...

ঘটনাটি ঘটল এইভাবে—

১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছরই আমি কাজ থেকে ৫–৬ দিনের ছুটি নিয়ে পান্ধারপুর, গাণগাপুরের মতো বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে দেবদর্শনের জন্য যেতাম। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালেও মালিককে আগে থেকেই জানিয়ে, যথাযথভাবে ছুটি নিয়ে ৪ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দেবদর্শনে গিয়েছিলাম।

কাজে থাকাকালীন আমি রাতে মালিকের বাংলোতেই ঘুমাতাম, কারণ মালিক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোলহাপুরে থাকতেন। কিন্তু সেদিন দীর্ঘ যাত্রার কারণে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম বলে রাতে বাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন প্রতিদিনের মতো ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে মালিকের গোয়ালঘরে গেলাম এবং দুধ দোহন করার পর সেই দুধ নিয়ে ‘দুগ্ধ সমবায় সমিতিতে’ দিয়ে এলাম। এরপর সকাল সাতটা নাগাদ মালিকের বাংলোয় পৌঁছলাম।

সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমি হতবাক হয়ে গেলাম...

বাংলোর দরজাটি অর্ধেক খোলা ছিল। ভিতরে ঢুকে সামনের দৃশ্যটি দেখেই আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। দেখি, বাংলোর সমস্ত জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, বাড়িতে চুরি হয়েছে। ভয়ে আমি মনে মনে বাপুকে ডাকতে শুরু করলাম। তারপর সঙ্গে সঙ্গে মালিককে ফোন করে পুরো ঘটনাটি জানিয়ে দিলাম।

কিছুক্ষণ পর মালিক সেখানে এসে পৌঁছালেন। তিনি বাংলোর প্রতিটি জায়গা ভালোভাবে পরিদর্শন করলেন। এরপর তিনি আমাদের জানালেন যে, চোরেরা সিন্দুক ভেঙে তার ভিতরে রাখা প্রায় ২০ তোলা সোনা, ৩৫ কেজি রুপো এবং কিছু নগদ টাকা নিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পত্তি চুরি হয়েছে।

এক মুহূর্তের জন্য আমরা সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এত বড় অঙ্কের সম্পত্তি চুরি হয়েছে, এই কথা শুনে কেউই যেন কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারছিলাম না।

এরপর মালিক পুলিশ স্টেশনে ফোন করে চুরির খবর দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে পৌঁছাল এবং তদন্তের কাজ শুরু করে দিল। আর আমি প্রতিদিনের মতোই মালিকের বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের চা-জল ও খাবার পরিবেশন করতে লাগলাম।

এমন সময় হঠাৎ মালিক ওপরের তলা থেকে আমাকে ডেকে পাঠালেন।

সেখানে মালিক এবং কয়েকজন পুলিশ আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। সম্ভবত মালিকই আমাকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কারণ, তাঁদের মধ্যে একজন পুলিশ আধিকারিক আমাকে কাছে ডেকে নিলেন। তারপর আক্ষরিক অর্থেই আমার জামার কলার চেপে ধরে, রাগে চিৎকার করে এবং কোমরে থাকা বন্দুকের দিকে হাত দেখিয়ে বললেন,

 “সঞ্জ্যা, চুরি হওয়া মালপত্র আর চোর কোথায় আছে, এখানেই বলে দে। নইলে তোর অবস্থা ভালো হবে না।” কথাগুলো শুনে যেন মুহূর্তের মধ্যেই আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। কারণ, যে মানুষটির বাড়িতে আমি গত ছয় বছর ধরে অত্যন্ত সততার সঙ্গে কাজ করে আসছিলাম, পরিবারের একজন সদস্যের মতোই যাঁর বাড়িতে অবাধে চলাফেরা করতাম, সেই মালিকই আমার বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, আমার ওপর চুরির অভিযোগ এনেছেন, এই বিষয়টি আমাকে সেই মুহূর্তে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল।

কিন্তু আমি নিজেকে সামলে নিলাম। মনে মনে শুধু বললাম, ‘হরি ওম বাপু।’ তারপর যে পুলিশ আধিকারিক আমার জামার কলার ধরে রেখেছিলেন, তাঁর হাতটা সরিয়ে দিয়ে শান্তভাবে শুধু বললাম, “সাহেব, অকারণে আমার ওপর কোনো দোষ চাপাবেন না। এই ডাকাতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

আমার কথা শুনে সেই পুলিশ আধিকারিক আবার রাগে চিৎকার করে উঠলেন, “এই-ই-ই! মিথ্যে কথা বলে নাটক করিস না। তুই দেবদর্শনে যাওয়ার পরেই এই ডাকাতি কী করে হল বল তো? তুই-ই নিশ্চয় চোরদের সব খবর দিয়েছিস। আর কারও সন্দেহ না হয়, তাই দেবদর্শনে যাওয়ার নাটক করেছিস। নিশ্চয়ই কোথাও কোনো সুন্দর জায়গায় বসে মজা করছিলি! চুপচাপ সব সত্যি কথা বলে দে, নইলে তোকে…”

আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলাম। তাই বাড়ির মালিককে বললাম, “মালিক, এই ঘটনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আপনারা আমার ওপর যতই মিথ্যে অভিযোগ চাপান না কেন, আমি ভয় পেয়ে কোনো মিথ্যা জবানবন্দি দেব না, এটুকু আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই।” ( মনে মনে তখন শুধু একটাই কথা বলছিলাম, “হরি ওম বাপু! আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করো, আমাকে এই মিথ্যে অভিযোগ থেকে মুক্ত করো।”) 

কিন্তু আমার মালিকদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে, ডাকাতির ঘটনায় আমি চোরদের সাহায্য করেছি। তাই সম্ভবত তাঁরাই আমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। মালিকের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আমাকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করল। আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে আমাকে পুলিশ ভ্যানে তুলে দেওয়া হলো। পুলিশের গাড়িটি এবার থানার দিকে রওনা দিল। হাতকড়া পরা অবস্থায় সেই পুলিশ ভ্যানে বসে আমি একদিকে যেমন অসহায়ভাবে সামনে তাকিয়ে ছিলাম, অন্যদিকে তেমনি মনে মনে শুধু বাপুর নাম জপ করছিলাম, “হরি ওম বাপু…”

ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে আমার মাথার মধ্যে তখন চিন্তার ঝড় বয়ে চলেছিল। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না। অবশেষে চোখ বন্ধ করে মনে মনেই বাপুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম।

আমি অভিমানে বাপুকেই বলতে লাগলাম, “বাপু, আমার জীবনে এমন দুঃসময় তুমি আসতেই দিলে কী করে? তুমি তো চাইলে এই বিপদটা আমার জীবনে আসার আগেই থামিয়ে দিতে পারতে! তাহলে আমাকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে দিলে কেন?”

সেই মুহূর্তে দুঃখ, অসহায়ত্ব আর অভিমানে আমি যেন আমার বাপুকেই দোষ দিতে শুরু করেছিলাম।

আমি যখন মনে মনে বাপুকে এই কথাগুলোই বলছিলাম, ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ ভ্যানের ব্রেক কষার তীব্র শব্দ হলো। আমি চমকে উঠে চোখ খুলে সামনে তাকালাম, কেন গাড়ি থেমে গেল তা দেখার জন্য। দেখলাম, হঠাৎ একটি গরু গাড়ির সামনে এসে পড়ায় ড্রাইভারকে আচমকা ব্রেক কষতে হয়েছে।

গাড়ির ভেতরে থাকা সবাই আবার নিজেদের সামলে নিয়ে ঠিকভাবে বসে পড়ল। ঠিক তখনই হঠাৎ একজন কনস্টেবল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই চুরির সঙ্গে জড়িত কিনা, সেটা তো তদন্তেই জানা যাবে। তবে আমি শুধু এটুকুই বলছি, তুই যদি সত্যিই নির্দোষ হোস, আর সেই ডাকাতির রাতে যদি তুই ওই বাংলোতেই ঘুমিয়ে থাকতিস, তাহলে ডাকাতরা প্রথমেই তোকে মেরে ফেলত, তারপর ডাকাতি করত। আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই তোকে কথাটা বলছি।”

এই কথাগুলো বলেই কনস্টেবলটি চুপ করে গেল। আর আমি নিঃশব্দে বসে রইলাম। তার কথাগুলো যেন আমার মনের মধ্যে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল।

মনে হলো, যেন কেউ আমাকে গভীর ঘুম থেকে হঠাৎ ঝাঁকিয়ে তুলে জাগিয়ে দিল! সত্যিই আমার সারা শরীরে শিহরণ জেগে উঠল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

তখন যেন হঠাৎ আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল, বাপু আমাকে কোনো বিপদের মধ্যে ঠেলে দেননি, বরং উল্টে সেই বিপদের মধ্যেই আমার প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। অথচ আমি কী না সেই বাপুকেই দোষ দিচ্ছিলাম! এই উপলব্ধি হতেই আমার দু’চোখ জলে ভরে উঠল। গভীর অনুতাপ আর কৃতজ্ঞতায় আমি মনে মনে বাপুর কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, “বাপু, আমাকে ক্ষমা করো। তোমার কৃপা বুঝতে না পেরে আমি তোমাকেই দোষ দিয়েছি।”

আসলে আমি দেবদর্শনে যাওয়ার তারিখটা আরও কিছুটা পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হয়, ঠিক সেই সময়ে আমাকে দেবদর্শনের জন্য অন্য শহরে যেতে হবে, এটা আমার জীবনে সেই দয়াময় সদ্গুরুতত্ত্বই যেন ১০৮ শতাংশ নিশ্চিতভাবে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। কারণ ডাকাতির সময় আমি যদি সেই বাংলোতেই উপস্থিত থাকতাম, তাহলে কী ঘটত কে জানে! সম্ভবত সেই ডাকাতরা আমাকে সেখানেই মেরে ফেলত। আজ ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, যেটাকে তখন আমি দুর্ভাগ্য বলে মনে করেছিলাম, সেটাই আসলে ছিল বাপুর অপার কৃপা, আমাকে বিপদের মধ্যে ফেলা নয়, বরং এক ভয়াবহ বিপদ থেকে আমার প্রাণ রক্ষা করা।

এই ভাবনাটি মনে দৃঢ়ভাবে স্থির হতেই বাপুর প্রতি আমার বিশ্বাস যেন আরও বহুগুণ বেড়ে গেল। আমার মনে এক অটুট বিশ্বাস জন্ম নিল, আমার বাপুই আমাকে এই বিপদ থেকে অবশ্যই বের করে আনবেন। এই দৃঢ় বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করে, এরপর যা-ই পরিস্থিতি আসুক না কেন, সাহসের সঙ্গে তার মোকাবিলা করার জন্য আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম।

পুলিশের ভ্যানটি থানায় পৌঁছাল। আমাকে থানার লকআপে নিয়ে গিয়ে রাখা হলো। এই ঘটনার পর আমার স্ত্রী ও সন্তানরাও মানসিকভাবে ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। আমি যে সম্পূর্ণ নির্দোষ, সে বিষয়ে তাদের মনে কোনো সন্দেহই ছিল না। কিন্তু জেলে আমার সঙ্গে কী হতে পারে, এই চিন্তায় তারাও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।

আমার গ্রেপ্তারের পরদিন খবরের কাগজের প্রথম পাতাতেই ডাকাতির খবর প্রকাশিত আর সেই খবরের একটি বক্সে আমার নামটি মোটা অক্ষরে ‘সন্দেহভাজন অভিযুক্ত’ হিসেবে ছাপা হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই আমার গ্রেপ্তারের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এর ফলে আমার পরিবারের লোকজনের পক্ষে বাড়ির বাইরে বেরোনোও দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল।

এদিকে পুলিশ হেফাজতে, পুলিশকর্মীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছিল যে আমি ডাকাতদের সঙ্গে জড়িত। আমার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তারা একের পর এক নানা পন্থা অবলম্বন করতে শুরু করল, প্রথমে অপেক্ষাকৃত কোমল পদ্ধতি, আর তাতে কাজ না হলে ধীরে ধীরে কঠোর পদ্ধতিও প্রয়োগ করতে লাগল।

এর মধ্যে একবার তো আমার মনোবল ভেঙে দিয়ে যাতে আমি স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হই, সেই উদ্দেশ্যে পুলিশ আমার হাতে দড়ি বেঁধে থানার সামনে থেকে গ্রামের প্রধান চত্বর পর্যন্ত আমাকে প্রকাশ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। যে গ্রামে আমার শৈশব কেটেছে, যে গ্রামের প্রায় সকল মানুষই আমার পরিচিত, সেই গ্রামের রাস্তায় আমি মাথা নিচু করে হাঁটছিলাম। তাই আমার চোখের সামনে তখন শুধু আমার গলায় থাকা বাপুর লকেটটিই ভেসে উঠছিল। থানায় নিয়ে আসার পর পুলিশ লকেটটি খুলে রাখতে বলেছিল, কিন্তু আমি তা খুলতে অস্বীকার করেছিলাম। সেই লকেটের মধ্যে থাকা বাপুর ছবিটির দিকেই আমি তাকিয়ে ছিলাম। মনের মধ্যে তখন একটানা বাপুর নামজপ চলছিল। আর আমার চোখের অশ্রুধারা যেন আপনাআপনিই বাপুর চরণে অভিষেক হয়ে ঝরে পড়ছিল। মনে মনে নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, ‘বাপু নিশ্চয়ই এর মধ্য থেকেও কোনো না কোনো পথ বের করে দেবেন।’ সেই বিশ্বাসটুকুই তখন আমার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এরপর পরবর্তী সাত দিন ধরে আমার সঙ্গে আরও অনেক কঠোর ও নির্মম আচরণ করা হয়েছিল। একের পর এক সেইসব অত্যাচার আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু আমি শুধু মনের মধ্যে বাপুর নাম জপ করে যাচ্ছিলাম এবং নীরবে সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছিলাম।

এই সমস্ত নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বাপুর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে এতটুকুও চিড় ধরেনি। আমাকে থানায় নিয়ে আসার পর বাড়ির লোকজন যখন প্রথমবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, তখনই আমি তাঁদের কাছে বাপুর আশীর্বাদ দেওয়ার ছবি-সহ ‘কৃপাসিন্ধু’ পত্রিকার একটি সংখ্যা এবং উপাসনার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী আনিয়ে নিয়েছিলাম। এরপর প্রতিদিন নিয়ম করে আহ্নিক, ‘ওঁ মনঃসামর্থ্যদাতা শ্রী অনিরুদ্ধায় নমঃ’ এই তারকজপ, অন্যান্য উপাসনা এবং আরতি করতাম। এর পাশাপাশি কয়েকটি পেন্সিলও আনিয়ে নিয়েছিলাম। সেই পেন্সিল দিয়ে আমি জেলের দেওয়ালে বাপুর নাম লিখতাম। যতদিন আমি পুলিশ হেফাজতে ছিলাম, ততদিনে জেলের একটি গোটা দেওয়াল যেন বাপুর নামে ভরে উঠেছিল। কঠিনতম সেই সময়েও বাপুর নামই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয় ও অবলম্বন।

আমার মনে হয়, এই কারণেই এত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও আমার মনোবল অটুট ছিল। এমনকি একদিন এক কনস্টেবলও নিজেকে সামলাতে না পেরে আমার ওপর চিৎকার করে বলেছিল, ‘তুই মানুষ তো, নাকি জন্তু? এত কিছু হওয়ার পরও তোর মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোয় না! অন্য বন্দিদের আমাদের টেনেহিঁচড়ে এই ঘরে আনতে হয়, অথচ তুই নিজেই নিজের পায়ে হেঁটে এখানে চলে আসিস!’ সেই কথাগুলো শুনেও আমি নীরবই ছিলাম। বাপুর প্রতি অটুট বিশ্বাসই যেন আমাকে সমস্ত কষ্ট সহ্য করার শক্তি জুগিয়েছিল।

আমি পিছন ফিরে তাকে শুধু এতটুকুই বলেছিলাম, ‘আমার বাপু… আমার সদ্গুরু অনিরুদ্ধ বাপু সবসময় আমার সঙ্গে আছেন। এই কষ্ট সহ্য করার শক্তিও তিনিই আমাকে দিচ্ছেন, আর ভবিষ্যতেও তিনিই আমাকে সেই শক্তি দিয়ে যাবেন, এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’ আমার কথা শুনে সে কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

জেলে আমাকে দেখতে আসার জন্য আমার পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্ধারিত সময়ে তারা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। একদিন দেখা করার পর আমার স্ত্রী আমাকে জানাল, আমার মা-বাবারও নাকি মনে হয়েছে যে আমি দোষী। সেই কারণেই তাঁরা জেলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতেও এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই কথা শুনে আমি আরও গভীরভাবে দুঃখ পেলাম। আপনজনদের কাছ থেকেও এমন ধারণার কথা জানতে পেরে মনটা ভেঙে পড়েছিল। তবুও আমি হাল ছাড়িনি। বরং আরও বেশি নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সঙ্গে বাপুর উপাসনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম।

এইভাবেই আটটি দিন কেটে গেল। অষ্টম দিনেও প্রতিদিনের মতো বাপুর উপাসনা করলাম। তারপর সারাদিনের অন্যান্য কাজও যথারীতি চলল। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। স্ত্রী ও সন্তানরা আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। আজ কী হয়েছিল জানি না, কিন্তু তাদের দেখামাত্রই আমার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তারা যেন কিছু বুঝতে না পারে, তাই চোখের ওপর হাত বুলিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। কারণ পুলিশের নির্মম রিমান্ড, সমাজের কাছে ঘটে যাওয়া এই অপমান ও লাঞ্ছনা, আর তার পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তান এবং মা-বাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা, সবকিছু মিলিয়ে আমি মানসিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলাম এবং ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো সেই কারণেই সেদিন আমার চোখের জল আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।

প্রথমে আমি সন্তানদের সঙ্গে কিছুক্ষণ শান্তভাবে, মন খুলে কথা বললাম। তাদের কিছু দায়িত্বের কথাও বুঝিয়ে বললাম। বললাম, ‘মায়ের আর দাদু-দিদার ভালোভাবে খেয়াল রেখো।’ কিন্তু কথাগুলো বলতে গিয়েই আবার আমার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠল। স্ত্রী ও সন্তানরাও কাঁদতে শুরু করল।

পরে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে আমি বললাম, ‘বাপু আছেন। তিনিই সবকিছু সামলে নেবেন। তোমরা একদম মনোবল হারিয়ে ফেলো না।’

এরপর আমি সন্তানদের বাইরে যেতে বললাম এবং আমার স্ত্রী অমিতার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল, আজকের সাক্ষাতের সময়ও যেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই অমিতার সঙ্গে আমি মন খুলে অনেক কথা বললাম। এমন সময় বাইরে থেকে এক কনস্টেবল চিৎকার করে জানাল, ‘সময় শেষ হয়ে গেছে।’

অমিতা চলে যাচ্ছিল। আমি তার হাত ধরে তাকে থামালাম এবং বললাম, ‘আমি এখন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। শুধু বাপুর স্মরণ থেকে যে শক্তি পাচ্ছিলাম, সেই শক্তির জোরেই এতদিন সবকিছু সহ্য করে এসেছি। কিন্তু এখন আর সহ্য করতে পারছি না গো। এই সবকিছু আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে! তোমাকে মন খুলে, সত্যি কথা বলছি, আগামীকাল সকালে বাপুর উপাসনা করার পর আমি নিজেকে শেষ করে দেব। তুমি সন্তানদের ভালোভাবে দেখাশোনা কোরো। ওদের ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার চেষ্টা কোরো।’

আমার এই কথা শুনে অমিতা আরও বেশি কাঁদতে শুরু করল। সে বারবার আমাকে অনুরোধ করতে লাগল, ‘এমন কিছু কোরো না, দয়া করে!’ ঠিক তখনই বাইরে থেকে এক মহিলা কনস্টেবল ভেতরে এসে অমিতার হাত ধরে তাকে জোর করে বাইরে নিয়ে যেতে লাগল। চোখে জল নিয়ে বাইরে চলে যাওয়ার সময়ও অমিতা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল। আমাদের দু’জনেরই তখনও অনেক কথা বলার ছিল, মনের অনেক কথা একে অপরকে জানানো বাকি ছিল। কিন্তু সাক্ষাতের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই অসম্পূর্ণ কথাগুলো বুকের মধ্যেই রয়ে গেল।

সন্ধ্যা সাতটা বাজল। সেদিন রাতে আমি আর খাবারও খাইনি। ঘুমোতে যাওয়ার আগে বাপুকে স্মরণ করে, তাঁর নামজপ করতে করতে শুধু এতটুকুই বললাম, ‘বাপু, আমার মনের অবস্থা তো তুমি জানোই। তোমার ওপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।’ বাপুর সঙ্গে মনের কথা বলে তারপর ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু মাথার মধ্যে নানা চিন্তার তাণ্ডব চলতেই থাকল। কিছুতেই চোখে ঘুম এল না।

আকাশ-পাতাল ভেবে সারা রাত জেগেই কাটালাম। ভোর ৪টে বাজল। আমি বিছানা থেকে উঠলাম, নিজেকে শেষ করে ফেলার এক শক্ত সংকল্প নিয়েই!

আমি স্নান করে এসে প্রতিদিনের মতো আমার নির্দিষ্ট উপাসনার জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনে ‘কৃপাসিন্ধু’ পত্রিকাটি রাখলাম। পত্রিকার প্রচ্ছদে ছিল বাপুর আশীর্বাদ দেওয়ার ছবি। আমি সম্পূর্ণ উপাসনা করলাম। আহ্নিকও সম্পন্ন করলাম। এরপর বাপুর আরতি করলাম। আরতি শেষ করে চোখ বন্ধ করে আরও একবার অন্তর থেকে বাপুকে প্রণাম জানালাম। তারপর মনে মনে স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে ক্ষমা চাইলাম।

আমার কাছে দাড়ি কামানোর জন্য আনা একটি ব্লেডের প্যাকেট রাখা ছিল। সেই প্যাকেট থেকে একটি ব্লেড বের করে ডান হাতে নিলাম এবং বাঁ হাতের কবজির ওপর সেটি রাখলাম।

সকাল প্রায় পাঁচটা বাজবে। থানার ভেতরে আমি তখন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময় থানার বাইরে থাকা ল্যান্ডলাইন ফোনটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটানা বেজে অবশেষে থেমে গেল।

তৃতীয়বার যখন ল্যান্ডলাইনের ফোনটি বেজে উঠল, তখন আমি নিজের হাতের শিরা কাটার জন্য মনে মনে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ‘করব কি করব না’, এই দ্বন্দ্বে আমার মন প্রায় পাঁচ-দশ মিনিট ধরে দোলাচলে ছিল। ঠিক সেই সময় এক কনস্টেবল চিৎকার করতে করতে আমার কাছে ছুটে এসে বলল, ‘ওরে সঞ্জ্যা… ব্যাটা! তুই বেঁচে গেলি রে! কিছুক্ষণ আগেই সেই চোরগুলো ধরা পড়েছে!’

কনস্টেবলের সেই কথা শুনে আনন্দে যেন আমার সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ব্লেডটি এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিলাম। সামনে তখনও বাপুর ছবিটি রাখা ছিল। কাঁদতে কাঁদতেই আমি ছবিটির সামনে আক্ষরিক অর্থেই লুটিয়ে পড়লাম। আমার আনন্দ যেন আর ধরছিল না। আমি জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলাম, ‘দেখলেন! আমি বলছিলাম না, বাপু আমার সদ্গুরু, আমার বাপ। আর তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন!’

এরপর কনস্টেবল আমাকে লকআপের বাইরে নিয়ে এল। আমার সেই চিৎকারে থানার সমস্ত কনস্টেবল এবং অন্যান্য বন্দিরাও ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল। তারা সবাই বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

ফোনটি এসেছিল ইচলকরঞ্জি থানার পক্ষ থেকে। সেই সময় থানার পুলিশপ্রধান নিজেই ফোনে কথা বলছিলেন। তিনি জানালেন, দস্যুতার ঘটনায় জড়িত সেই চোরদের ভোর সাড়ে চারটের সময় ইচলকরঞ্জি বাসস্ট্যান্ড থেকে চুরি করা সমস্ত মালপত্র-সহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা নিজেদের অপরাধের কথাও স্বীকার করেছে। এর পাশাপাশি তিনি আরও নির্দেশ দিলেন, ‘আপনাদের থানায় বন্দি থাকা সন্দেহভাজন অভিযুক্ত সঞ্জয় যাদবকে অবিলম্বে লকআপ থেকে বের করে দিন। আমরা পুলিশ ভ্যানে করে ওই চোরদের আপনাদের থানায় নিয়ে আসছি।’

এরপর আমাদের থানার পুলিশপ্রধান এবং অন্যান্য সমস্ত পুলিশকর্মী আমার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মান ও ভদ্রতার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন।

পুলিশপ্রধান তো এমন কথাও বলেছিলেন, ‘আরে, তুমি যেমন বলেছিলে, সত্যিই তো তোমার বাপুই তোমাকে রক্ষা করলেন!’

এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই বাপু কে? কোথায় থাকেন?’ আমি তাঁকে বিস্তারিতভাবে বললাম, কীভাবে আমি বাপুর ভক্ত হয়ে উঠলাম এবং তাঁর উপাসনা করতে শুরু করলাম। এরপর আমি তাঁকে পড়ার জন্য ‘কৃপাসিন্ধু’ পত্রিকাটি দিলাম। তিনি একটি চেয়ারে বসে পত্রিকাটি উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলেন। আর আমি তাঁর সামনের চেয়ারে বসে রইলাম।

কিন্তু তখন আমাদের কথোপকথনের দিকে আমার একেবারেই মন ছিল না। আমার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, ‘বাপু কীভাবে এমনটা ঘটালেন? আসলে ঠিক কী ঘটেছিল?’

মনের মধ্যে তখন একের পর এক নানা প্রশ্ন এসে ভিড় করছিল। কীভাবে সবকিছু ঘটল, বাপু কীভাবে আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করলেন, এই এক গভীর কৌতূহলই আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এমন সময় সাহেবের সঙ্গে আমার কথাবার্তা চলছিল, ঠিক তখনই ইচলকরঞ্জি থেকে সেই পুলিশ ভ্যানটি চোরদের নিয়ে আমাদের থানায় এসে পৌঁছাল। তারা ছিল চারজন, এই চারজনই মিলে ডাকাতির ঘটনাটি ঘটিয়েছিল। আমাদের থানার পুলিশপ্রধান প্রথমে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে সেই চোরদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই ব্যক্তিকে তোমরা চেনো? চুরি করার সময় এ তোমাদের কোনোভাবে সাহায্য করেছিল?’

তখন তাদের মধ্যে একজন চোর স্পষ্টভাবে বলল, ‘আমরা ওঁকে চিনি না।’ কিন্তু কথাটি বলার সময়ও তার চোখ বারবার পুলিশপ্রধানের টেবিলের ওপর রাখা বাপুর ‘কৃপাসিন্ধু’ পত্রিকাটির দিকেই চলে যাচ্ছিল। কথা বলতে বলতেই সে ধীরে ধীরে টেবিলটির কাছে এগিয়ে এল।

তার মুখের অভিব্যক্তিতে যেন স্পষ্ট প্রশ্নের ছাপ ফুটে উঠেছিল। পুলিশপ্রধানের অনুমতি নিয়ে সে ‘কৃপাসিন্ধু’ পত্রিকাটি হাতে তুলে নিল। পত্রিকার প্রচ্ছদে থাকা বাপুর ছবিটির দিকে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। থানায় উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ভরা চোখে সেই চোরটির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার এমন আচরণে সবার মনেই যেন নানা প্রশ্ন জেগে উঠেছিল।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেখানে এক অদ্ভুত, গা ছমছমে নীরবতা নেমে এসেছিল…

ঠিক সেই সময় চোরটি পত্রিকার প্রচ্ছদে থাকা বাপুর ছবিটি পুলিশপ্রধানকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সাহেব, এই মানুষটি কে? চুরি করার মুহূর্ত থেকেই আমাদের বারবার মনে হচ্ছিল, এই লোকটি যেন আমাদের পিছু নিয়েছে। কখনও তাঁকে দেখা যাচ্ছিল, আবার পরক্ষণেই যেন তিনি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর কারণেই আমাদের পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হয়েছে। তা না হলে আমরা অনেক আগেই পালিয়ে যেতে পারতাম। তাঁকে দেখতে অনেকটা যেন কোনো পুলিশ অফিসারের মতো লাগছিল, তাই আমরা আরও বেশি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আজ সকালেও যখন আমরা ইচলকরঞ্জি এস.টি. বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিলাম, তখনও আমাদের মনে হচ্ছিল, এই লোকটি যেন সামনের বেঞ্চে বসে আছেন! এই ব্যক্তি কে? সত্যিই কি তিনি কোনো পুলিশ অফিসার?’

চোরটির সেই কথা শুনে আবারও আমার সারা শরীরে শিহরণ জেগে উঠল। আমার চোখ দুটো জলে ভরে উঠতে লাগল। এই অভিজ্ঞতাটি পড়ে হয়তো অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগবে, ‘এটা কীভাবে সম্ভব?’ কিন্তু যা ঘটেছে, যা শুনেছি এবং যা নিজের চোখে অনুভব করেছি, তার সবটুকুই আমি এখানে সম্পূর্ণ সত্য হিসেবে তুলে ধরেছি। যাই হোক, এভাবেই সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং ডাকাতির মিথ্যা অভিযোগ থেকে আমার বাপুই আমাকে রক্ষা করেছিলেন, এটাই আমার অটুট বিশ্বাস। বাপুরায়া, তোমার শ্রদ্ধাবান ভক্তদের জীবনে অসম্ভবকে সম্ভব হতে আমরা বারবারই দেখেছি। আজ আমি এবং আমার পরিবারের সকলেই যে আনন্দে ও শান্তিতে আছি, তা শুধু তোমারই কৃপায়। আমাদের দিয়ে যেন এভাবেই তোমার ভক্তি ও সেবা করিয়ে নাও। ‘বাপু, তুমি আমাদের সদ্গুরু, তুমি আমাদের বন্ধু, তুমি আমাদের পিতা তুমিই আমাদের সবকিছু।’

------------------------------------------------

Comments