এক মাসের শিশুর সোয়াইন ফ্লু—অনিরুদ্ধবাপুই রক্ষা করলেন — অমিত সিঙ্ঘল, দিল্লি

এক মাসের শিশুর সোয়াইন ফ্লু—অনিরুদ্ধবাপুই রক্ষা করলেন  — অমিত সিঙ্ঘল, দিল্লি

আমি অমিত সিঙ্ঘল। দিল্লির বাসিন্দা। পেশায় আমি একজন আর্কিটেক্ট, বিল্ডিং ডিজাইনের কাজ করি এবং বড় বড় কমপ্লেক্সের নকশা তৈরি করি। ২০০৫-০৬ সালের দিকে পরমপূজ্য সদ্গুরু শ্রীঅনিরুদ্ধবাপু সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি আমার ভগ্নীপতি ডাঃ অজয় রাঘবের কাছ থেকে। সদ্গুরুকৃপায় তাঁর ছেলে কীভাবে ব্লাড ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধি থেকে রক্ষা পেয়েছিল, সে সমস্ত ঘটনা আমার জানা ছিল। তবুও তখনও বাপুর প্রতি আমার বিশ্বাস জন্মায়নি। অন্যদিকে, আমার স্ত্রী বাপুকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। বাপু সম্পর্কে জানার পর আমাদের বাড়িতে বাপুর একটি ছবি আসে। প্রায় দশ বছর ধরে আমরা পরিবারের সবাই সাঁইবাবার ভক্তি করি। কিন্তু আমার নিজের মন তখনও সেই সদ্গুরুতত্ত্বকে অন্য এক রূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না।

২০১০ সালের ঘটনা। ৩০ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে আমার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। আমার একটি বড় মেয়ে রয়েছে, আর এই ছোট মেয়েটি তখন সদ্যোজাত। ২০০৯ সালে সর্বত্র সোয়াইন ফ্লু-এর ভয়াবহ প্রকোপ চলছিল। মেয়েদের কখনও সামান্য কাশি হলেও মনে মনে ভয় পেতাম, এটা সোয়াইন ফ্লু নয় তো? স্কুলেও সোয়াইন ফ্লু নিয়ে যথেষ্ট আতঙ্কের পরিবেশ ছিল। বড় মেয়ের কাশি হলে, যতক্ষণ না নিশ্চিত হতাম যে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে, ততক্ষণ তিন-চার দিন তাকে নিয়ে পাশের ঘরে আলাদা করে ঘুমাতাম। জ্বর পুরোপুরি কমে গেলে আবার আমরা সবাই একসঙ্গে ঘুমাতাম। এইভাবেই ভয় আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিনগুলি কাটছিল।

২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বড় মেয়ের আবার জ্বর ও কাশি শুরু হলো। এভাবে তিন-চার দিন কেটে গেল। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডাক্তার, এটা সোয়াইন ফ্লু নয় তো?’ ডাক্তার বললেন, ‘জ্বর তো কমে আসছে, তাই এটা সোয়াইন ফ্লু নয়। এখন মেয়ে ভালো আছে, একেবারে স্বাভাবিক আছে।’ চার দিন অপেক্ষা করার পর, মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠেছে ভেবে আবার তাকে নিয়ে আমার ছোট মেয়ের সঙ্গে একই ঘরে ঘুমাতে শুরু করলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা ইচ্ছা থেকেই গিয়েছিল, একবার সোয়াইন ফ্লু-এর পরীক্ষা করিয়ে নিই। কারণ নিজের সন্তানকে নিয়ে প্রত্যেক বাবা-মায়েরই তো স্বাভাবিকভাবেই ভয় ও দুশ্চিন্তা থাকে; তারা যেন কোনোভাবেই অসুস্থ না হয়, সেটাই আমরা চাই।

তাই মেয়ের জ্বর ইতিমধ্যেই সেরে গেলেও, শুধুমাত্র কৌতূহলবশত তার সোয়াইন ফ্লু-এর পরীক্ষা করালাম। সন্ধ্যা পাঁচটার সময় রিপোর্ট এল। রিপোর্টে লেখা, সোয়াইন ফ্লু ‘পজিটিভ’!

সোয়াইন ফ্লু ‘পজিটিভ’, এই রিপোর্টটি দেখার পর আমাদের হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। এখন কী করব? কোনো কিছু না ভেবেই বড় মেয়েকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে আমরা ডাক্তারের কাছে ছুটে গেলাম। ডাক্তার রিপোর্টটি দেখে ‘ট্যামিফ্লু’ ওষুধ লিখে দিলেন।

তারপর ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কারা কারা এই রোগীর সংস্পর্শে এসেছে?’ আমরা জানালাম, ‘আমি, আমার স্ত্রী, মামা এবং আমার দু’মাসের ছোট মেয়েটিও ওর সংস্পর্শে এসেছে।’ এ কথা শুনে ডাক্তার আমাকে, আমার স্ত্রীকে এবং মামাকেও ট্যামিফ্লু-এর ওষুধ লিখে দিলেন। কিন্তু ছোট মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করতেই ডাক্তার বললেন, ‘এক বছরের কম বয়সি শিশুকে এই ওষুধ দেওয়া চিকিৎসাগতভাবে সম্ভব নয়।’

আমি তখন প্রায় কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারকে অনুরোধ করলাম, ‘ডাক্তার, ছোট মেয়েটার জন্যও কিছু ওষুধ দিন। এখন ওর কী হবে?’

তখন ডাক্তার বললেন, ‘এখন ওকে একমাত্র ঈশ্বরই রক্ষা করতে পারেন। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করুন। আমি ওর জন্য কোনো ওষুধ লিখে দিতে পারব না।’

বড় মেয়ের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে ওষুধের সন্ধানে হাসপাতালে গেলাম। গোটা দিল্লি চষে ফেললাম, কিন্তু কোথাও ট্যামিফ্লু-এর ওষুধ পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা ৬টার সময় অ্যাপোলো হাসপাতালে গেলাম। সেখানকার কেমিস্টের কাছে ওষুধ ছিল, কিন্তু মাত্র তিনটি বোতল। তিনি জানালেন, ‘এগুলো শুধু এই হাসপাতালের রোগীদের জন্য রাখা হয়েছে।’ তাই অনেক অনুরোধ করেও তিনি ওষুধ দিতে রাজি হলেন না। আমি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমার মেয়ের এই ওষুধ ভীষণভাবে প্রয়োজন। কিন্তু ওষুধগুলি শুধুমাত্র হাসপাতালের রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট থাকায় তিনি আমাকে দিতে পারলেন না।

একেবারে হতভম্ব ও অসহায় হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে দেখি, মেয়ের মুখ ও কান দিয়ে জল বেরোতে শুরু করেছে। তার জ্বর পৌঁছে গিয়েছে ১০৬ ডিগ্রি পর্যন্ত!

এদিকে আমার স্ত্রী গাড়িতে বসে কাঁদছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘তুমি ওষুধ আনতে পারলে না কেন? ওরা যদি না দেয়, তাহলে জোর করে নিয়ে এসো!’ কিন্তু আমি কীভাবে কেমিস্টের কাছ থেকে ওষুধ ছিনিয়ে নিয়ে আসব? আমি তো তা করতে পারি না!

তখন আমাদের পক্ষ থেকে করার মতো সমস্ত মানবিক প্রচেষ্টাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন কী হয়, অসহায়ভাবে তা দেখেই যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।

ঠিক সেই সময় আমার স্ত্রী প্রথমবার আমাকে বলল, ‘এখন অন্তত সদ্গুরুর শরণ নাও। একবার বাপুকে বলো। বাপুর সামনে হাত জোড় করে, একেবারে মন থেকে বাপুকে স্মরণ করে তাঁকে বলো।’ চোখের সামনে নিজের মেয়ের প্রাণ যেন ধীরে ধীরে নিভে যেতে দেখছিলাম। সেই মুহূর্তে জীবনে প্রথমবার আমি অন্তর থেকে বাপুকে বললাম, ‘বাপু, এবার আপনিই ওকে বাঁচান।’

মনে মনে বাপুকে এই কথাটি বলা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ আমার মোবাইলের রিং বেজে উঠল। ফোনটি ছিল সেই ডাক্তারবাবুর, যাঁর কাছে মেয়েকে দেখিয়ে আমরা এসেছিলাম।

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়েকে ওষুধ দিয়েছেন?’ আমি বললাম, ‘না ডাক্তার। গোটা দিল্লি খুঁজে খুঁজে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি, কিন্তু কোথাও ওষুধ পাচ্ছি না।’ ডাক্তার আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা এখন কোথায় আছেন?’ আমি জানালাম, ‘আমি এখন অ্যাপোলো হাসপাতালের বাইরে আছি।’

তখন ডাক্তার বললেন, ‘আপনি আবার ভেতরে যান। আপনার নাম বলুন। ওই কেমিস্ট আপনার জন্য ওষুধ রেখে দিয়েছেন।’

এ কথা শুনে আমার যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মাত্র দু’মিনিট আগেও কত অনুরোধ, কত কাকুতি-মিনতি করেও যে কেমিস্ট আমাকে ওষুধ দিতে রাজি হননি, এমনকি ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দিয়েছিলেন, তাঁর কাছেই আবার কেন যাব?

তবুও ডাক্তার বলছেন এবং মনে একটু আশার আলো জেগেছে, এই ভরসায় আবার সেই কেমিস্টের কাছে ফিরে গেলাম।

আর কী বলব আপনাদের! মাত্র দু’মিনিট আগেও যে কেমিস্ট ওষুধ দিতে একেবারেই রাজি ছিলেন না, তাঁর কাছে গিয়ে যখন আবার বললাম, ‘আমার ট্যামিফ্লু-এর ওষুধ চাই’, তখন তিনি আমার নাম জানতে চাইলেন। আমি নাম বলতেই, মাত্র পাঁচ মিনিট আগে যিনি আমাকে ওষুধ দিতে সোজাসুজি অস্বীকার করেছিলেন, সেই মানুষটিই এবার ট্যামিফ্লু-এর ওষুধের একটি বোতল বের করে আমার হাতে দিয়ে দিলেন! বোতলটি হাতে পাওয়ার পরও যেন আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। স্ত্রীর কথায় আমি মনে মনে বাপুর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, তার মধ্যেই সেই ডাক্তারবাবুর ফোন এসেছিল, আর পাঁচ মিনিট আগেও যে কেমিস্ট আমাকে বলেছিলেন, ‘ওষুধ দেব না’, তিনিই এসে ওষুধের বোতল আমার হাতে তুলে দিলেন!

আমার কাছে গোটা ঘটনাটাই ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় এবং অতর্কিত!

আমি বাইরে এসে মেয়েকে ওষুধ খাওয়ালাম। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই ওষুধের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করল। মেয়ের শারীরিক অবস্থারও ধীরে ধীরে উন্নতি হতে লাগল। কান ও নাক দিয়ে যে জল বেরোচ্ছিল, তা বন্ধ হয়ে গেল। জ্বরও আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। আমরা আবার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। এখন মাথাটা একটু ঠান্ডা হওয়ায়, গত পনেরো মিনিটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। তখনই একটা কথা মনে হলো, ডাক্তারবাবু আমাকে ফোন করলেন কীভাবে? আমি তো জীবনে প্রথমবার ওই ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়েছিলাম। এমনকি তাঁর কাছে আমার মোবাইল নম্বরও ছিল না। তাহলে তিনি আমাকে ফোন করলেন কীভাবে? এই প্রশ্নটাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু মোবাইল হাতে নিয়ে ফোনটা দেখে নেওয়ার কথাই তখন মনে হয়নি, কে ফোন করেছিলেন, কোন নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, কিছুই দেখিনি। কারণ তখন বাড়ি ফেরার জন্য ভীষণ তাড়াহুড়ো করছিলাম। বাড়িতে দু’মাসের ছোট মেয়েটিকে রেখে এসেছিলাম, তার কাছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছিল।আর মোবাইলে তো সমস্ত ফোনের রেকর্ডই থাকে, কিন্তু তখন সেসব দেখার মতো মানসিক অবস্থাই ছিল না।

বাড়ি ফিরে দেখি, ছোট মেয়েটি বেশ আনন্দে খেলছে, একেবারে সুস্থ-স্বাভাবিকই আছে। বড় মেয়ের সোয়াইন ফ্লু-এর পরীক্ষা করানোর সময় আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনেই পরীক্ষা করিয়েছিলাম। রাত আটটার দিকে রিপোর্ট এল, আমার স্ত্রীও ‘সোয়াইন ফ্লু পজিটিভ’! এবার মনে হতে লাগল, যেন সবকিছুই আমাদের হাতের মুঠো থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। কারণ মাত্র দু’মাসের ছোট মেয়েটি তখন মায়ের বুকের দুধই খেত। আর যে শিশু সোয়াইন ফ্লু পজিটিভ মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে, তারও নিশ্চয়ই সোয়াইন ফ্লু হয়ে থাকবে, এই আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল। এখন কী করব? কিছুতেই কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে এসেছিল।

আমার স্ত্রী আমাকে দ্বিতীয়বার বলল, ‘আপনি মুম্বাইয়ে পূজ্য সমীরদাদাকে ফোন করুন।’ তখন প্রথমবার উত্তরাখণ্ডের রুরকি থেকে ড. অজয় রাঘবের কাছ থেকে সমীরদাদার ফোন নম্বর পেলাম। দাদাকে ফোন করে বললাম, ‘দাদা, কী করব? ছোট মেয়েটার জন্য কোনো ওষুধই নেই, তার ওপর সোয়াইন ফ্লু হওয়ার সম্ভাবনাও খুব বেশি।’

দাদা বললেন, ‘আধ ঘণ্টার মধ্যে তোমাকে জানাচ্ছি।’ তখন রাত দশটা। রাত সাড়ে দশটায় আবার দাদাকে ফোন করলাম। দাদা বললেন, ‘মেয়েটাকে কোলে নিয়ে ওর মা-বাবা দু’জনে নিরন্তর হনুমান চালিসা পাঠ করো।’  কিন্তু এদিকে আমার স্ত্রীও সোয়াইন ফ্লু-তে আক্রান্ত, আর বড় মেয়েটিকেও দেখাশোনা করতে হবে। আমরা তখন বাড়িতে মাত্র চারজন। এই অবস্থায় ছোট মেয়েটাকে কোলে নিয়ে আমরা দু’জনে কীভাবে হনুমান চালিসা পাঠ করব, সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

তখন মেয়েদের মামা ড. অজয় রাঘবকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হলো। ড. অজয় রাঘব ও তাঁর স্ত্রী সবিতা রাঘব রাত সাড়ে দশটায় রুরকি থেকে রওনা দিলেন এবং রাত দু’টোর সময় দিল্লিতে পৌঁছলেন। রাত দু’টোর সময় ছোট মেয়েটিকে তাঁদের জিম্মায় দিয়ে দিলাম। তাঁরা মেয়েটিকে তাঁদের থাকার জায়গায় নিয়ে গেলেন এবং সেখানেই হনুমান চালিসা পাঠ শুরু করলেন। ভোর তিনটের সময় তাঁদের ফোন এল, ‘ওর জ্বর বাড়ছে।’যে ছোট মেয়েটি এতক্ষণ পর্যন্ত একেবারে সুস্থ ছিল, তার মধ্যেও এবার সোয়াইন ফ্লু-এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। নাক-মুখ দিয়ে জল পড়তে শুরু করল এবং জ্বরও বাড়তে লাগল। দাদার সঙ্গে কথা বললাম। দাদা বললেন, ‘হনুমান চালিসার পাঠ নিরন্তর চালিয়ে যাও।’ এরপর আমরা সমস্ত আত্মীয়স্বজনকেও জানালাম, ‘ওর জন্য সবাই হনুমান চালিসা পাঠ করুন।’

এইভাবেই হনুমান চালিসার নিরন্তর পাঠ শুরু হলো। ড. রাঘব ও তাঁর স্ত্রী ছোট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে হনুমান চালিসা পাঠ করছিলেন, আর আমরা বড় মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হনুমান চালিসার পাঠ করছিলাম। সকাল ন’টার দিকে, কোনো ওষুধ ছাড়াই ছোট মেয়েটির জ্বর কমতে শুরু করল। ধীরে ধীরে জ্বর একেবারে সম্পূর্ণ সেরে গেল! এই ঘটনাটির কোনো ব্যাখ্যাই যেন প্রচলিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুক্তি ও পরিসরের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

ট্যামিফ্লু-এর পাঁচ দিনের কোর্স ছিল। পাঁচ দিন পর আবার ডাক্তারের কাছে গেলে, ডাক্তার প্রথমেই ছোট মেয়েটির খোঁজ নিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের ছোট মেয়েটি কেমন আছে?’ আমি বললাম, ‘ডাক্তার, এখন ও একেবারে ভালো আছে। ওর আর কিছুই হয়নি।’ এ কথা শুনে ডাক্তারও বললেন, এটি যেন কোনো ঈশ্বরীয় অলৌকিক ঘটনা। তিনি বললেন, ‘আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে দু’মাসের শিশু সোয়াইন ফ্লু-আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে বুকের দুধ খেয়েছে, আবার সোয়াইন ফ্লু-আক্রান্ত নিজের দিদির সংস্পর্শেও থেকেছে, সেই শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে বেঁচে আছে, এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্ভব নয়।’

এটি ছিল আমাদের জীবনে সেই সদ্গুরুতত্ত্বের প্রথম বড় অভিজ্ঞতা। এরপর জীবনে একের পর এক এত অভিজ্ঞতা হলো, এত কিছু ঘটল যে ধীরে ধীরে বাপুর প্রতি আমার বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করল। কিন্তু ‘আমি বাপুকে মানি’, এই কথাটি প্রকাশ্যে বলতে তখনও আমার একটু সংকোচ ও লজ্জা বোধ হতো। আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, ‘এখন তো বাপুকে মানো, তাই না? এখন তো বাপুর পূজাও করো, তাই না?’

কিন্তু তখনও আমি লুকিয়ে লুকিয়েই বাপুর আরাধনা করতাম। গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করাও শুরু করেছিলাম। অথচ কেউ যদি আমার সামনে বাপুর কথা বলত, তখনও আমি বাপুকে মানি, এ কথা স্বীকার করতে চাইতাম না। তবে মনের গভীরে বিশ্বাসটা তখন তৈরি হয়ে গিয়েছিল, ‘হ্যাঁ, এই মানুষটিই যেন আমার জীবনের সদ্গুরু!’

এবার ২০১০ সালের মার্চ মাসের কথা। যে ছোট মেয়েটি সোয়াইন ফ্লু থেকে বেঁচে গিয়েছিল, একদিন হঠাৎ তার খিঁচুনি শুরু হলো। এ যেন এপিলেপ্সির অ্যাটাক। সেই সময় শিশুটির সারা শরীরে প্রবলভাবে কাঁপুনি ও ঝাঁকুনি হচ্ছিল। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে এটা খিঁচুনির আক্রমণ। মনও কিছুতেই তা মেনে নিতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল, হয়তো কোনো ভয় থেকে এমন হয়েছে, অথবা কোনো অশুভ প্রভাব পড়েছে।

মেয়েকে নিয়ে দু-তিনটি মন্দিরেও গেলাম, কিন্তু তাতেও কোনো পরিবর্তন হলো না। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় দিনে মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম।

ডাক্তার বললেন, ““এটা ফিটেরই লক্ষণ। ওর খিঁচুনির অ্যাটাক হচ্ছে।” ‘খিঁচুনি’ কথাটা শুনেই যেন আমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল, মনে হলো আমার প্রাণটাই বেরিয়ে গেল। ডাক্তার ওর ওষুধ শুরু করলেন এবং সেই ওষুধগুলোর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর কথাও জানালেন। কিন্তু ওষুধ শুরু করা ছাড়া আর কোনও উপায়ই ছিল না। তাই ওষুধ শুরু করলাম। ওকে টানা ১০ দিন হাসপাতালে রাখা হলো। কিন্তু তাতেও খিঁচুনি আসা বন্ধ হলো না। বারবার ওর খিঁচুনি হচ্ছিল। ধীরে ধীরে এমন একটা অবস্থা হলো যে, ওর খিঁচুনি দেখতেও যেন আমাদের অভ্যাস হয়ে গেল!

দুই মাস ধরে ওর ওষুধ চলছিল। কিন্তু ফিট আসা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছিল না। দিনে পাঁচবার পর্যন্ত ফিট আসত। পাঁচ থেকে ছয়, ছয় থেকে সাত, এভাবে ক্রমশ ফিটের সংখ্যা বাড়তেই থাকল। তিন মাস পর, অর্থাৎ এপ্রিল ২০১০-এ, একজনের পরামর্শে আমরা এই বিষয়ে ভারতের অন্যতম সেরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সবরওয়াল-এর কাছে গেলাম। ডা. সবরওয়াল ওকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে বললেন, “তিন দিন পর ওর ব্রেন ম্যাপিং করব। EEG-ও করব। আমার কিছু সন্দেহ হচ্ছে।”

তারপর তিন দিন পর, সকাল ৭টায় আমরা আমাদের মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম। সকাল ৭টায় ডাক্তার ওর মস্তিষ্কের EEG পরীক্ষা করলেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সকাল ৮টার মধ্যেই রিপোর্ট ডাক্তারদের টেবিলে এসে গেল। সকাল ৮টার সময় আমি ও আমার স্ত্রী আমাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কেবিনে গেলাম। ডাক্তার রিপোর্টটি ভালোভাবে দেখে বললেন, “আমি আপনাদের একেবারে সহজ ভাষায় বোঝাচ্ছি। আপনাদের মেয়ের ‘কার্টোজেনিক ইনফ্যান্টাইল স্পাজম’-এর সমস্যা রয়েছে। এই সমস্যার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনাদের মেয়ে আর স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারবে না। এই মেয়ে হয়তো কোনওদিন বসতে পারবে না, হাঁটতে পারবে না, এমনকী কথাও বলতে পারবে না।”

ডাক্তারের প্রতিটি কথা শুনতে শুনতে আমরা আরও অসহায় হয়ে পড়ছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রী সেখানেই কাঁদতে শুরু করলাম।

ডাক্তার বললেন, “কাঁদবেন না! আমি আপনাদের সবকিছু স্পষ্ট করে বলছি। এই রোগটিকে এখন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটিই ওষুধ রয়েছে, সেটিকে আমরা ‘স্টেরয়েড’ বলি। আপনাদের মেয়ের জন্য এর বাইরে আমার কাছে আর কোনও ওষুধ নেই।” ডাক্তার সেই ওষুধটি লিখে দিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে বললেন, “একবার স্টেরয়েড দেওয়া শুরু করলে ওকে খুব সাবধানে রাখতে হবে, এমনকী অযথা স্পর্শও করবেন না। কারণ স্টেরয়েড শরীরকে এতটাই দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দিতে পারে যে, ওর গাল ফুলে যেতে পারে, চোখ কিছুটা বাইরে বেরিয়ে আসার মতো দেখাতে পারে। এমনকী হাত ধরে টান দিলেও হাড়ের জায়গা সরে যেতে পারে, আঙুলেও সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এই ওষুধ ছাড়া আমার কাছে আর কোনও বিকল্প নেই। আপনাদের এই ওষুধ দিতেই হবে।”

আমি আবার ডাক্তারের কাছে হাতজোড় করে জিজ্ঞেস করলাম, “ডাক্তার, আপনারা ভালো করে পরীক্ষা করেছেন তো?” ডাক্তার বললেন, “রিপোর্ট তো আপনাদের সামনেই রয়েছে।” রিপোর্টগুলো হাতে নিয়ে আমরা ডাক্তারের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার স্ত্রী হাউহাউ করে কাঁদছিল। মনে হচ্ছিল, আমাদের হাত থেকে যেন সবকিছুই ধীরে ধীরে ফসকে যাচ্ছে। ডাক্তার আরও বলেছিলেন, “আপনাদের মেয়ে কোনওদিন হাঁটতে পারবে না। ও সারাজীবনের জন্য প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে।” আমার স্ত্রী বলল, “আপনি সুচিতদাদার সঙ্গে কথা বলুন। এখন বাপুই আমাদের একমাত্র ভরসা।” সকাল ১১টার দিকে দাদার ক্লিনিকে থাকা ডা. লিনমের সঙ্গে আমাদের কথা হলো। তিনি মেয়ের সমস্ত রিপোর্ট ফ্যাক্স করে পাঠাতে বললেন। আমরা রিপোর্টগুলো ডা. লিনমকে ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, দাদাকে রিপোর্টগুলো দেখিয়ে নিয়ে দুপুরে আবার ফোন করতে। দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ডা. লিনমের সঙ্গে আবার কথা হলো। তিনি জানালেন, “দাদা বলেছেন, ওর নতুন চিকিৎসা শুরু করুন। দাদা ওকে স্টেরয়েডের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। আপনারা স্টেরয়েড দিন।”

এরই মধ্যে আমরা আমাদের পরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ এবং পারিবারিক চিকিৎসকদের পরামর্শও নিয়েই চলছিলাম। তাঁরা প্রত্যেকেই বললেন, “স্টেরয়েড দেবেন না। চার মাসের শিশুকে স্টেরয়েড দিলে ওর স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে স্টেরয়েড না দিলে অন্তত স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সামান্য হলেও সম্ভাবনা থাকে। আর একবার স্টেরয়েড দেওয়া শুরু করলে পরবর্তীকালে সর্দি, কাশি বা জ্বর হলে সেসবের কোনও ওষুধই ঠিকমতো কাজ করবে না।” এত কিছু শোনার পর স্টেরয়েড দেওয়ার সাহসই আর হচ্ছিল না। দাদা স্টেরয়েড দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তবুও আমরা ওষুধটি শুরু করিনি। সারাদিন ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলাম। যে যে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছেন, “স্টেরয়েড দেবেন না। ভবিষ্যতে এই মেয়েটির জ্বর এলে, কাশি হলে তখন কী করবেন?”

সেই কঠিন, অথচ তাঁদের দৃষ্টিতে বাস্তবসম্মত কথাগুলো শুনে মনে হলো, যেন মাথায় বাজ পড়ল। বারবার সেই কথাগুলোই মাথার মধ্যে ঘুরছিল। তাই মেয়েকে স্টেরয়েড দিলাম না।

কিন্তু এরই মধ্যে ওর দিনে যে ১০ বার করে ফিট আসত, সেই সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল। পরের দিন তা বেড়ে দাঁড়াল ৭০-এ।

বলা হয়, একটি শিশুর একবার ফিট হলে, মাত্র এক সেকেন্ডের সেই খিঁচুনির সময় শরীরকে এতটাই পরিশ্রম করতে হয়, যতটা কাজ শরীর সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় করে। আর সেই চার মাসের ছোট্ট মেয়েটির দিনে যেখানে ৭০ বার ফিট আসছিল, তা বেড়ে ১০০ বার হয়ে গেল। তৃতীয় দিনে সেই সংখ্যা পৌঁছে গেল ২৫০-তে!

এখন আমরা কী করব?

তখন আবার আমার স্ত্রী বলল, “একবার দাদার উপর বিশ্বাস রাখো এবং ওকে ওষুধটা দাও।” মেয়ের অবস্থা তখন এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, ও সারাক্ষণ কাঁপত। কাঁপতে কাঁপতে ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত, তারপর ভীষণ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। মেয়েটার দিকে তাকালেই আমাদের চোখে জল চলে আসত।

চতুর্থ দিন আমার স্ত্রী বলল, “তুমি দাদা অনুমোদিত ওষুধটা ওকে দাও। তা না হলে আমি চলে যাব।” তখন দাদার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রেখে আমরা মেয়েকে স্টেরয়েড দেওয়া শুরু করলাম। কিন্তু পঞ্চম দিনে ওর ফিটের সংখ্যা বেড়ে ৩০০-তে পৌঁছে গেল। তবুও স্টেরয়েড চালিয়ে গেলাম।

ষষ্ঠ দিনে ৩০০ থেকে ফিটের সংখ্যা বেড়ে ৩৫০-তে পৌঁছে গেল। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সেদিনই মুম্বাইয়ে দাদার ক্লিনিকে ফোন করলাম। রাত ১০টার দিকে ডা. লিনমের সাহায্যে দাদার সঙ্গে কথা বলতে পারলাম। দাদা বললেন, “একদম চিন্তা করবেন না। আপনারা ওর চিকিৎসা চালিয়ে যান। যা হচ্ছে, হতে দিন। শুধু ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখুন এবং ওর স্টেরয়েডের ওষুধ চালিয়ে যান।” দাদার কথাগুলো শুনে আমাদের মনের অনেকটা দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা কমে গেল।

ডাক্তাররা আমাদের বলেছিলেন, মেয়ের প্রতিটি ফিটের হিসাব লিখে রাখতে। তাই এক দিনে ওর কতবার ফিট হচ্ছে এবং প্রতিবার কতক্ষণ ধরে থাকছে, সেসব আমরা একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতাম। মেয়ের পাশেই সবসময় ডায়েরিটা রাখা থাকত। আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করার সাহস হতো না, সারাদিনে মেয়ের কতবার ফিট হয়েছে। ওরও আমাকে বলার মতো মানসিক শক্তি থাকত না যে, দিনে কতবার ফিট হয়েছে। অফিস থেকে ফিরে এসে চুপচাপ ডায়েরিটা খুলে দেখতাম, সারাদিনে কতবার ফিট হয়েছে। মেয়েটার দিকে তাকালেই চোখে জল চলে আসত। তারপর আর কিছু দেখতে পারতাম না, ডায়েরিটা বন্ধ করে রেখে দিতাম।

ষষ্ঠ দিন রাতে দাদার সঙ্গে কথা বলার পর, সপ্তম দিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরলাম। প্রতিদিনের মতো ডায়েরি খুলে দেখলাম, ডায়েরিতে একটি ফিটেরও কোনো নথি নেই। মনে হলো, হয়তো স্ত্রী ফিটের কথা লিখতে ভুলে গেছে। কিন্তু তাঁকে জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। মনে তখন নানা রকম মিশ্র অনুভূতি। সত্যিটা জানার সাহসও হচ্ছিল না, সত্যিই কি আজ সারাদিন মেয়েটির একবারও ফিট আসেনি, নাকি স্ত্রী শুধু ডায়েরিতে লিখতে ভুলে গেছে?

বাইরে এসে দেখি, স্ত্রী বাইরে বসে আছে। মনে হলো, ওকে জিজ্ঞেস করি, আজ মেয়েটার ফিট এসেছিল কি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। পরের দিন আবার অফিসে গেলাম। রাতে অফিস থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো ডায়েরিটা খুললাম। আবারও ডায়েরিতে একটিও ফিটের নথি নেই। কী করে সম্ভব? এমন তো হতে পারে না! নিশ্চয়ই স্ত্রী নথি করতে ভুলে যাচ্ছে। স্ত্রীর ওপর ভীষণ রাগ হলো। বাইরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি দু’দিন ধরে ওর ফিটের কোনো নথি রাখছ না কেন? ডাক্তার তো এই নথির ভিত্তিতেই পরবর্তী চিকিৎসা করবেন।” স্ত্রী বলল, “দু’দিন ধরে ওর একবারও ফিট আসেনি, তাহলে কীসের নথি রাখব?”

আমি যেন হতবাক হয়ে গেলাম! সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম, সদ্গুরুর তাঁর ভক্তদের প্রতি কতটা গভীর ভালোবাসা, আর সদ্গুরুর মুখের প্রতিটি আশ্বাসবাণীতে কতখানি শক্তি থাকে! এক মাস ধরে আমার মেয়ের চিকিৎসা চলল। এই এক মাসে তার না জ্বর এল, না কাশি হলো; কোলে তুলে নিলে তার হাত আর খুলে গেল না; তার গালও ফুলে বাইরে বেরিয়ে এল না, চোখও নয়। এসব একমাত্র সেই ‘সদ্গুরুর’ পক্ষেই সম্ভব। তাঁর আশ্বাসবাণীই যেন আমার মেয়েকে রক্ষা করেছিল। এরপর এক মাস পর তাকে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার তাকে ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন, “আমার জীবনে এটাই প্রথম এমন ঘটনা। সম্ভবত ভারতেও এটাই প্রথম ঘটনা, সোয়াইন ফ্লু-তে আক্রান্ত একটি শিশু আজ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমার সামনে বসে আছে।” এদিকে মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল। ছোটবেলাতেই এত বেশি মাত্রায় ফিট হয়ে যাওয়ার কারণে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ কিছুটা ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। মেয়েটির তখন ৯ মাস বয়স হয়ে গেছে, অথচ সে এখনও নিজে বসতেও পারত না, এমনকি তার একটিও দাঁতও ওঠেনি!

২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার মেয়েটিকে দাদার কাছে দেখাতে এবং তাঁর আশীর্বাদ নিতে মুম্বই নিয়ে এলাম। সকাল ১১টার দিকে দাদার কাছে মেয়েটিকে দেখালাম। দাদাকে বললাম, “দাদা, এখনও ওর দাঁত ওঠেনি।” দাদা বললেন, “ডোন্ট ওরি। ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখো, ও সবকিছুই করতে পারবে! ওকে নিয়ে একদম চিন্তা করো না। ও তো সদ্গুরু বাপুর কৃপাছত্রের তলেই রয়েছে।” দাদার কথায় বিশ্বাস রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। দুপুর ১টার দিকে বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। আমাদের বিমান ছিল দুপুর ৩টায়। সেখানে বসে স্যান্ডউইচ খাচ্ছিলাম। স্যান্ডউইচ খেতে খেতেই বড় মেয়ে বলল, “পাপা, ওকেও একটু স্যান্ডউইচ দাও।”

তখন আমি স্যান্ডউইচের সামান্য একটা টুকরো ছোট মেয়েটিকে খাওয়ালাম। হঠাৎ আমার আঙুলে যেন কিছু একটা বিঁধল। মনে হলো, অসাবধানতাবশত স্যান্ডউইচের প্যাকেটের সঙ্গে থাকা কোনো স্ট্যাপল পিন হয়তো ভুল করে ওর মুখে চলে গেছে! তাই সেটা বের করার জন্য মুখের ভেতর আঙুল দিলাম। কিন্তু কোনো পিন পেলাম না।

তখন ভাবলাম, তাহলে কী বিঁধল? ভালো করে মেয়েটির মুখের ভেতর তাকিয়ে দেখি, ওর ওপরের আর নিচের মাড়ির মাঝখানে সাদা সাদা একটা রেখা ঝিকমিক করছে...

দাঁত! 

এখানেও প্রথম দেখায় আমার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কিন্তু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতেই বুঝলাম, সত্যিই তো... দাঁত!

এ যেন সেই সদ্গুরুতত্ত্বের অকারণ করুণারই চরম প্রকাশ!

সকাল ১১টার সময় আমরা দাদার সঙ্গে দেখা করে বলছিলাম, “দাদা, ওর ৯ মাস বয়স হয়ে গেল, তবুও এখনও ওর দাঁত ওঠেনি।” আর তার ঠিক পরের দুই ঘণ্টার মধ্যেই দেখলাম, ওর ওপরের এবং নিচের, দুই জায়গাতেই দাঁত উঠতে শুরু করেছে!

আমি চিৎকার করে উঠলাম। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” আমি বললাম, “দেখো, ওর দাঁত উঠেছে!” সে বলল, “কী বলছেন আপনি! আপনি হয়তো ভুল দেখেছেন!”

তারপর সে নিজে ভালো করে দেখে নিশ্চিত হলো, সত্যিই মেয়েটির ওপরের ও নিচের মাড়িতে দুটো করে দাঁত উঠছে! আমি, আমার বড় মেয়ে আর স্ত্রী, আমরা তিনজন সেখানেই মেঝেতে বসে মনে মনে দাদাকে বললাম, “দাদা, এ সবই বাপুর কৃপা।”

তারপর বাড়ি ফিরে এলাম। আমাদের আনন্দের যেন শেষ ছিল না। কিন্তু আমার বাপুর অকারণ করুণা এখানেই শেষ হয়নি। এরপর কী ঘটল, দেখুন, এবার মেয়েটির বয়স ১৫ মাস। ২০১১ সালের মার্চ মাসের কথা। দাঁত উঠেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও সে আর কিছুই করতে পারছিল না। আবার মুম্বই এলাম। আবার দাদার কাছে মেয়েটিকে দেখালাম। দাদাকে বললাম, “দাদা, ওর এখন প্রায় দেড় বছর বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও নিজে বসতে পারে না, হাঁটতেও পারে না। দাদা, ও কবে হাঁটতে পারবে? এভাবে তো ও অনেক পিছিয়ে পড়বে!”

দাদা আবারও সেই একই কথা বললেন, “তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখুন। এই মেয়েটির সবকিছুই ভালো হবে। ওকে নিয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন।” দাদার আশীর্বাদ নিয়ে আবার দিল্লি ফিরে এলাম। দিল্লিতে ফিরে আমি আর আমার স্ত্রী বাইরে হলঘরে বসে টিভি দেখছিলাম। দুই মেয়েই ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল।

হঠাৎ বড় মেয়ে খুব জোরে আমাদের দু’জনকে ডাকতে লাগল। তার সেই ডাক শুনে ভয় পেয়ে আমরা দু’জনেই দৌড়ে ভেতরে গেলাম। গিয়ে দেখি কী আশ্চর্য!

যে মেয়েটি এতদিন পর্যন্ত নিজে বসতেও পারত না, কোনো কিছুই করতে পারত না, সেই মেয়েটিই বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে! তাকে এভাবে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বড় মেয়ে আমাদের ডাকছিল। আমাদের দু’জনকে দেখতে পেয়ে মেয়েটি তিন পা হেঁটে এসে সোজা আমাদের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ যে আমার সদ্গুরু বাপুরই আমার ওপর অকারণ কৃপা!

যে মেয়েটির সম্পর্কে ডাক্তার বলেছিলেন যে সে হয়তো কোনোদিনই বসতে, হাঁটতে বা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না, সেই মেয়েটিই দাদার সঙ্গে দেখা করে আসার মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটতেও শুরু করেছিল! সেই দিন থেকেই সদ্গুরু বাপুর প্রতি আমার বিশ্বাস অটুট হয়ে গেল। এখন যখনই আমরা মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই এবং তার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাই, তখন সেই ডাক্তার, যিনি ভারতের অন্যতম খ্যাতনামা শিশু-স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, মজা করে জিজ্ঞেস করেন, “ওকে মুম্বইয়ের ইঞ্জেকশন দিতে কবে নিয়ে যাচ্ছেন? ও যখনই মুম্বই যায়, তখনই ওর কিছু না কিছু উন্নতি হয়!” সত্যিই, আমার মনে হয়, এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনাও নয়, কোনো অলৌকিক ঘটনাও নয়। কারণ অলৌকিক ঘটনা বা কাকতালীয় ঘটনা একবার হতে পারে, দু’বারও হতে পারে; কিন্তু বারবার, একইভাবে ঘটতে পারে না।

এ একমাত্র সেই সদ্গুরুতত্ত্বের কৃপাই হতে পারে! তাঁদের প্রতি আমাদের যে অটুট বিশ্বাস, সেই বিশ্বাসের মাধ্যমেই যেন আমাদের জীবনে সদ্গুরুর কৃপাধারা অবিরাম বর্ষিত হয়।


Hindi English



Comments