পরমপূজ্য বাপুর সান্নিধ্যে আসার পর থেকে আমরা প্রতিনিয়ত এমন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, যা আমাদের মনে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় করে যে, আমাদের সমস্ত দায়িত্ব বাপুই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একইসঙ্গে, তিনি যে সর্বদা আমাদের সঙ্গে রয়েছেন, এই অনুভূতিও আমরা প্রতিটি মুহূর্তে লাভ করি। এমন সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী অভিজ্ঞতাগুলিই আমাদের মতো সাধারণ ভক্তদের বাপুর প্রতি বিশ্বাসকে ক্রমশ আরও দৃঢ় করে তোলে। আজ তেমনই একটি অভিজ্ঞতা আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
আমি সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা বিভাগের একজন সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। আমার অধীনে অনেক নার্স কাজ করেন, যাঁরা বিভিন্ন গ্রামে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের কাজকর্মের উপর নজরদারি করা এবং প্রয়োজনীয় তদারকি করাই আমার প্রধান দায়িত্ব। বরোদা তালুকের ‘করচিয়া’ নামে একটি গ্রাম রয়েছে, যা আহমেদাবাদ-মুম্বই রেলপথের কাছেই অবস্থিত। এটি একটি ফ্ল্যাগ স্টেশনও, যেখান থেকে ট্রেন চলাচলের জন্য লাল ও সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এখান থেকে রেলপথের বিভিন্ন দিকে যাওয়ার জন্য একাধিক শাখাপথ বেরিয়ে গেছে। ট্রেনের গতিপথ ও গন্তব্য অনুযায়ী ট্রেনগুলিকে বিভিন্ন ট্র্যাকে চালনা করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৬০টি ট্রেন এই রেলপথ দিয়ে চলাচল করে।
এপ্রিল মাসের প্রচণ্ড গরমের দিন ছিল। দুপুর তখন প্রায় একটা। এমন সময় আমি খবর পেলাম যে, কচরিয়া গ্রামে আমাশয় ও ডিহাইড্রেশনে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
এ ধরনের কোনও ফোন এলেই আমাকে সেখানে যেতে হয়। আমার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায়, প্রতিদিন তিনি স্কুটিতে করে আমাকে কর্মস্থলে পৌঁছে দিতেন এবং কাজ শেষ হলে আবার বাড়ি নিয়ে আসেন।
সেদিনও এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কচরিয়া গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম। রেললাইন পার হওয়ার সময় হঠাৎ দু’টি রেললাইনের মাঝখানে আমাদের স্কুটি আটকে গেল। আর মুহূর্তের মধ্যেই স্কুটিসহ আমরা দু’জনেই মাটিতে পড়ে গেলাম!
আমরা স্কুটি আর রেললাইনের মাঝখানে এমনভাবে অদ্ভুতভাবে আটকে গিয়েছিলাম যে নড়াচড়া করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। দুপুরবেলা হওয়ায় আশেপাশে লোকজনের যাতায়াতও ছিল না। আমি পুরোপুরি স্কুটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিলাম, আর আমার স্বামীর দু’টি পা স্কুটির নিচে আটকে ছিল। ফলে তিনিও উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না।
আমরা সাহায্যের জন্য প্রাণপণে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু আমাদের আর্তনাদ শোনার মতো আশেপাশে কেউ ছিল না। এমন সময় দূর থেকে একটি ট্রেনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। ট্রেনটি দেখতে পেয়েই আমাদের চোখের সামনে যেন সর্ষেফুল ফুটতে লাগল! ট্রেনের হুইসেলের শব্দ কানে আসতেই আমাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, ‘এবার বুঝি মৃত্যুর সময় এসে গেছে।’ মনে হচ্ছিল, এবার সবকিছুই শেষ!
ট্রেনটি তখন আমাদের থেকে আর বেশি দূরে ছিল না। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে, এই ভয়াবহ আশঙ্কায় আমাদের মনের মধ্যে একটিই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, “বাপু... বাপু... বাপু...”। বাপুর নাম ছাড়া আমাদের মনে আর দ্বিতীয় কোনও শব্দই ছিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ কোথা থেকে যেন একজন লোক আমাদের কাছে এসে হাজির হলেন। তিনি এক ঝটকায় আমাদের দু’জনকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমরা কোনওরকমে তাড়াতাড়ি স্কুটিসহ রেললাইনের অন্য পাশে পৌঁছে গেলাম। আর ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে ট্রেনটি আমাদের পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলে গেল!মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমাদের মৃত্যু এড়িয়ে গেল! কোন এক মরণফাঁদ থেকে সেই সদ্গুরুতত্ত্ব যে কত নিঃশব্দে, কত সহজে আমাদের দু’জনকে নিরাপদে বের করে এনেছিল, সেই উপলব্ধি হতেই আমাদের সারা শরীর শিউরে উঠল।
কোনওরকমে নিজেদের সামলে নিয়ে আমরা হাত-পায়ের ধুলো ঝেড়ে ফেললাম এবং যেখানে যেখানে আঘাত লেগেছিল, সেখানে রুমাল বেঁধে নিলাম। তারপর স্কুটিটি চালু করে দেখলাম, সেটিও সঙ্গে সঙ্গেই চালু হয়ে গেল। আমরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সেখান থেকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।
....আর ঠিক তখনই আমাদের সেই মানুষটির কথা মনে পড়ল, যিনি আমাদের আর মৃত্যুর মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
আমরা পিছন ফিরে সেই মানুষটিকে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোথাও তাঁর দেখা পেলাম না! আশেপাশে তো কেউ ছিলই না, এমনকি দূর-দূরান্তেও কোনও মানুষকে দেখা যাচ্ছিল না। তখনই যেন আমাদের বোধোদয় হল, এই মরণফাঁদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে কে এসেছিলেন! সেই মানুষটি যে-ই হয়ে থাকুন না কেন, আমাদের কাছে তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন আমাদের বাপুই!
আজও সেই ঘটনাটি মনে পড়লে সারা শরীরে শিহরণ জাগে। মনে প্রশ্ন আসে, সামনাসামনি ট্রেন ছুটে আসছে, আর স্কুটির নিচে দু’জন মানুষ আটকে রয়েছেন, এমন অবস্থায় এক মুহূর্তের মধ্যে স্কুটিসহ আমাদের দু’জনকে মৃত্যুর মুখ থেকে যিনি উদ্ধার করে বাঁচিয়েছিলেন, ‘তিনি’ আর কে হতে পারেন?
যিনি আমাদের নবজীবন দান করেছেন, তিনি যে আমাদের বাপুই, এ বিষয়ে আমাদের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।
সকলের রক্ষাকর্তা ও ত্রাণকর্তা পরমপূজ্য বাপুকে কোটি কোটি প্রণাম!!!
| Hindi | English |
|---|---|

Comments
Post a Comment