ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 3

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের না বলা ইতিহাসের এক ঝলক - ভাগ 3

এই ধারপুরেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা পুরনো, ভেঙে পড়া ধর্মশালা, ঘর, মহলগুলো থেকে আনা পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। আর এই কারণেই কারও মনে 'এটা মাত্র তিন বছর আগে তৈরি করা হয়েছে' এমন সন্দেহও আসেনি। মল্লাররাও বিশ্বাসঘাতকতার ঝুঁকি ভালোভাবে জানতেন। আর তাই তিনি অত্যন্ত গোপনে শিবলিঙ্গ এবং হরিহরের মূর্তি সেই জঙ্গলের জায়গায় এনে, সেই মূর্তির একপাশে ভেঙে যাওয়া দেওয়ালও আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিলেন। এমন জায়গা বেছে নিয়েছিলেন যেখানে ঝোপঝাড়ের ভিড় বেশি ছিল। পরে একদিন তাঁরই এক বিশেষ সহকর্মী তাঁর হারানো বাছুর খুঁজতে গিয়ে এই মন্দির 'হঠাৎ করে' খুঁজে পায়। আর তারপর সর্বদা দানশীল মল্লাররাও এগিয়ে এসে এটি তৈরি করান, এইটুকুই। গ্রামের নব্বই বছর পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধরাও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে তাদের ছোটবেলায় তারা শুনেছিলেন যে এখানকার শিব মন্দিরটি প্রায় দুই-একশো বছর আগে অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণে ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

এই মন্দিরটিকে 'শিবমন্দির' হিসেবেই খ্যাতি দেওয়া হয়েছিল। স্বয়ং ভগবানের হরিহরের মূর্তির উল্লেখ যাতে বেশি না হয়, সেদিকে পূর্ণ খেয়াল রাখা হয়েছিল। কারণ সেই মূর্তির ঠিক নিচে ছিল বিশাল এক ভোঁয়রা বা ভূগর্ভস্থ কক্ষ (base-ment), আর সেখান থেকে তিন দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার তিনটি সুরঙ্গ পথও ছিল। প্রধানত শিবমন্দিরের নকশাও জেনেবুঝে এমন বিচিত্র ধরণের তৈরি করা হয়েছিল যে তাতে অনেক কক্ষ ছিল - যা ব্যবহার হত মন্দিরের জিনিসপত্র রাখার জন্য, উৎসবের সময় দরকারি পালকি, বড় কাঠের রথ ইত্যাদি রাখার জন্য, চন্দন ঘষার জন্য, ফুলের মালা তৈরির জন্য এবং প্রধানত বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা-যাওয়া করা সাধুদের ও যাত্রীদের থাকার জন্য। তাতেও বিশেষ ব্যাপার হল এই মন্দিরের এই আবাসিক কক্ষগুলোতে কেউ দুই রাতের বেশি থাকতে পারত না। তারপর তাদের অন্য মন্দিরের ধর্মশালাগুলোতে সরিয়ে দেওয়া হত।

এই গুপ্ত ভোঁয়রা বা ভূগর্ভস্থ কক্ষ, তার মধ্যে থাকা সুরঙ্গ পথগুলো এবং মন্দিরের আবাসিক কক্ষগুলোই ছিল মল্লাররাওয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আনাগোনা করার জায়গা। আর এই মন্দিরে থাকতে আসা সমস্ত সাধু এবং যাত্রীদের ভালোভাবে পরীক্ষা করা হত, তবুও কেউ দুই দিনের বেশি থাকতে পারত না।

এখানে দীর্ঘদিন ধরে থাকতেন বিভিন্ন বেশে ঘোরাফেরা করা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দুটি দল - একটি হল আত্মগোপন করা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এবং অন্যটি বিপ্লবীরা। ভোঁয়রার বা ঐ ভূগর্ভস্থ কক্ষে অনেক গোপন আলমারি ছিল ও তাকে বেশ পরিবর্তন করার জন্য সব ধরনের সরঞ্জাম রাখা থাকত। ভারতের প্রতিটি প্রদেশের পোশাক, বিভিন্ন সাইজের এখানে সবসময় পাওয়া যেত।

এই মন্দিরের তিনজন বৃদ্ধ পূজারী ছিলেন এবং এই তিনজনই মল্লাররাওয়ের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বাংলা ভাষা শিখেছিলেন, অন্যজন পাঞ্জাবি এবং তৃতীয়জন হিন্দুস্থানী অর্থাৎ হিন্দি শিখেছিলেন। এর ফলে দেশজুড়ে থাকা বিপ্লবীদের এখানে সুবিধা দেওয়া সম্ভব হত।

আজ আসার সঙ্গে সঙ্গেই মল্লাররাও মন্দির ভালোভাবে দর্শন করে, দ্রুত ভোঁয়রাতে বা ভূগর্ভস্থ কক্ষে গেলেন। এমন যখন দিনের বেলা করতে হত, তখন পূজারীরা, তেল পড়ে গেল, ছাই উড়ল, গবাক্ষ দিয়ে পাখি ভেতরে ঢুকে গেল, টিকটিকি পাওয়া গেল এমন সব কারণ দেখিয়ে গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ করে দিতেন। রাতের বেলাতে তো কোনো সমস্যাই থাকত না।

মল্লাররাও ভোঁয়রাতে বা ভূগর্ভস্থ কক্ষে নামলেন এবং সরাসরি সেখানকার মোট 19টি কক্ষের মধ্যে 13 নম্বর কক্ষে গেলেন। প্রতিটি কক্ষের দরজায় নম্বর খোদাই করা ছিল। 'কক্ষের সংখ্যা ছিল 19টি', এমনটাই যে কোনো দর্শকের মনে হত; কিন্তু একই নম্বরের তিন-চারটি কক্ষও ছিল এবং একটি কক্ষের দেওয়াল থেকে খোলার মতো আরও একটি গুপ্ত কক্ষও থাকত।

এই ধরনের সব জটিল স্থাপত্য-রচনার নির্মাণ বিশেষজ্ঞ 'শিবরামরাজন' আজ তিন বছর পর প্রথমবার এখানে এসেছিলেন। সেটাও আগে থেকে জানিয়ে, উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্থানী বেশ নিয়ে এবং গ্রামের বাইরের হনুমান মন্দির থেকে আসা গুপ্ত পথ দিয়েই।

শিবরামরাজন মূলত মাদ্রাজ অঞ্চলের (বর্তমান তামিলনাড়ু) মানুষ ছিলেন। তিনিও ছিলেন প্রখর দেশভক্ত। তিনি বয়সে রামচন্দ্রের চেয়ে পনেরো বছরের বড় ছিলেন এবং মল্লাররাওয়ের চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন। তিনি রামচন্দ্ররাওয়ের সঙ্গেই গভর্নমেন্ট সার্ভিসে ছিলেন এবং গোপনে এই বাবা-ছেলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি চমৎকার মারাঠি এবং হিন্দিও বলতে পারতেন। তাই শিবরামরাজন কখনও 'শিবরাম' নামের একজন মারাঠি মানুষের মতন বেশ ধারণ করতেন, কখনও 'শিবরাজন' নামের একজন তামিল মানুষের মতন বেশ ধারণ করতেন, আবার কখনও 'শিবরাজ' নামের একজন উত্তর ভারতীয় মানুষের মতন বেশ ধারণ করতেন কিন্তু এই বাবা-ছেলে তাঁকে, খুব ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সময়ও 'ফকীরবাবা' বলেই উল্লেখ করতেন। কারণ কবীর পন্থী সাধুর বেশে তিনি ট্রেন বা নৌকাযোগে ভ্রমণ করতেন। আজও তিনি কবীর পন্থী সাধুর বেশেই এসেছিলেন।

মল্লাররাও কক্ষে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের দরজা ভালোভাবে বন্ধ করে নিলেন। ফকীরবাবা এবং মল্লাররাওয়ের মধ্যে আলিঙ্গন হল। মল্লাররাও প্রথমে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন এবং তারপর সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “কী খবর পেলেন?”

ফকীরবাবা অর্থাৎ শিবরামরাজনে-র মুখ এক মুহূর্তে উগ্র হয়ে উঠল। তাঁর চোখের রাগ ছিল যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। তিনি কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন, “মল্লাররাও! সমস্ত বিপ্লবীদের বিশ্বাসঘাতকতা তাঁদের আশপাশের ভারতীয় মানুষেরাই করছে। আজ পর্যন্ত ধরা পড়া বিপ্লবীদের মধ্যে 99% এর ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে। কখনও প্রতিবেশী, কখনও ব্রিটিশদের ভারতীয় গুপ্তচর, কখনও সরকার ঘোষিত পুরস্কারে লোভে পড়া মানুষ এবং কিছু জায়গায় তো প্রথমে আন্দোলনে থাকা, পরে সরে যাওয়া ভীরু যুবকেরাই।

কত ভারতীয়র রক্ত বইছে এবং আর কত দিন বইতে থাকবে? এই ধরনের বিশ্বাসঘাতকদের শিক্ষা দেওয়াটা আমার কাছে আরও বেশি জরুরি বলে মনে হচ্ছে।”

মল্লাররাও এক মুহূর্তও দেরি না করে বললেন, “হ্যাঁ। কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার থেকে সমস্ত সুবিধা দেওয়া হয়। এমন লোকদের শাস্তি তাহলে কে দেবে? আজ পর্যন্ত আমরা বিপ্লবীদের এবং আত্মগোপন করা স্বাধীনতা সেনানিদের সাহায্য করার কাজ করছিলাম। কিন্তু কোনো বৈপ্লবিক কাজে অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামে এবং গেরিলা যুদ্ধে (Guerilla Warfare) সরাসরি অংশগ্রহণ করিনি।

রামচন্দ্রের সাথে আমার পরশুদিনই কথা হয়েছে। এখন শুধু সমর্থন দিয়ে বা সাহায্য করে বা বিপ্লবীদের অস্ত্র সরবরাহ করে চলবে না। আমাদের সম্পূর্ণ দলের বৈপ্লবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া আবশ্যক এবং রামচন্দ্র পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়ে গেছে।

দুই মাস আগে ভগত সিংয়ের বলিদানের পর তো সারা দেশের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে (মার্চ 23, 1931)। আর দেরি করা চলবে না। 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস'-এর বাংলা থেকে আসা নেতা 'সুভাষচন্দ্র বোস'-এর সাথে অচিরেই যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি বিপ্লবী চিন্তাধারার, তরুণ এবং তেজস্বী একজন মানুষ। ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বিপ্লবী হয়েও তিনি গান্ধীজীর পথ গ্রহণ করেছেন, তা হল বিশাল ও ব্যাপক স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য।

তাঁর মতোই আমিও প্রকাশ্যে অহিংস দেশভক্ত হয়েছি। আর আপনি যে খবর এনেছেন তার সমাধান করার কাজ শুরু করতে চলেছি। সুভাষচন্দ্রের মতে দেশজুড়ে এমন একটি শৃঙ্খল বুনে তোলা দরকার।

জাল বুনার কাজ ও বিশ্বাসঘাতকদের শিক্ষা দেওয়ার কাজও আমরাই করি। সেই সব বিশ্বাসঘাতকদের মাথা কেটে নেওয়া উচিত।”

“কমপক্ষে এই বিশ্বাসঘাতকদের সমাজে জীবনধারণ করা কঠিন, অপমানজনক ও কষ্টকর হওয়া উচিত। আর এই কাজে আমরা নারীদের আগে এগিয়ে রাখব।” এই উক্তিটি ছিল জানকীবাইয়ের। সে গুপ্ত দরজা দিয়ে ভেতরে আসতে আসতে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলে গিয়েছিল, কিন্তু তার চেহারায় সংকল্প ছিল অত্যন্ত কঠোর।

(গল্পটি চলছে)

मराठी >> हिंदी >> English >> ગુજરાતી>> ಕನ್ನಡ>> తెలుగు>> தமிழ்>> മലയാളം>>

Comments