জানকীবাঈ পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা মতোই মুম্বই থেকে বিশেষ করে ফকীরবাবা অর্থাৎ শিবরামরাজন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। গত তিন বছর ধরে শিবরামরাজন জানকীবাঈকে ভালোভাবে চিনতেন। এই অল্পবয়সী যুবতীর মধ্যে যে বুদ্ধিমত্তা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, নির্ভয়তা এবং সংযমের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে, তা ফকীরবাবা পুরোপুরি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁকে ঝুঁকে প্রণাম করা জানকীবাঈকে আশীর্বাদ করে ফকীরবাবা বললেন,
তেমনি মধ্য ভারত ও দক্ষিণ ভারতের নারীরাও সুশিক্ষিত হতে শুরু করেছেন। শহরের বহু স্কুলে নারীরা যেতে শুরু করেছে। কিছু কিছু জায়গায় তো নারীদের জন্য আলাদা স্কুলও শুরু হয়েছে। তবে মুম্বাই ও পুনে নগরীর নারীরা আরও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশ নিতে শুরু করেছেন।
বিশ্বাসঘাতকদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ করার সময় আমাদের গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং সংযম রাখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, ‘আমাদের এই কাজটি হয়তো ভবিষ্যতে ইতিহাসে নথিভুক্ত হতেও পারবে না’—এটা জেনেই কাজে নামতে হবে। আমাদের এই কাজের পুরুষদেরও বাইরে থেকে ‘ব্রিটিশ-ঘেঁষা’ হিসাবে নিজেদের জাহির করতে হবে। হয়তো, যখনই স্বাধীনতা মিলবে, তখন আমাদের নাম দেশভক্তদের তালিকায় থাকবে না, এই বোধ আমাদের দলের প্রত্যেকের থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি জায়গায় জায়গায় এমনই নানা বয়সের পুরুষ কর্মীদের তৈরি করেছি এবং আমার স্ত্রীও মাদ্রাজ অঞ্চলে ঠিক এভাবেই মহিলা কর্মীদের গড়ে তুলেছেন।
জানকীবাঈ! তোমার ও রামচন্দ্ররাও-এর কাজ তো জোরদার চলছে। তোমার কিছু বিশেষ মহিলা কর্মীর সঙ্গে তুমি দেখা করার আয়োজন করেছ, এই বার্তা আমি পেয়েছি। সভা কোথায় আছে এবং ঠিক কোন বিষয়ে আছে, সেটাও আমি জানি না। তুমি নিজেই সরাসরি এখানে এসেছ, তার মানে সভা কি এখানেই?”
উত্তর দিলেন মলহাররাও, “হ্যাঁ! মুম্বাই, পুনে শহরে বর্তমানে প্রতিটি শিক্ষিত ব্যক্তির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। তাই এই শহরগুলিতে মহিলাদের প্রকাশ্যে হলুদ-কুমকুমের অনুষ্ঠান, মহিলা শিক্ষা পরিষদ, বিধবা ও পরিত্যক্তা (স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা) নারীদের জন্য আয়োজিত হওয়া নার্সিং প্রশিক্ষণ অথবা এমন নারীদের জন্য চালানো সেলাই শেখার কর্মশালা—এগুলোর উপরেও নজর রাখা হচ্ছে। ব্রিটিশরা যতটা মুম্বাই–পুণে আর কলকাতাকে ভয় পায়, ততটা অন্য কোনো প্রদেশকে ভয় পায় না, কারণ সবচেয়ে বেশি বিপ্লবী ও সশস্ত্র বিদ্রোহ এই দুটি প্রদেশেই হয়েছে। পাঞ্জাবও জ্বলছে। অনেক শিখ যুবক তো দেশের জন্য যেকোনো সময় প্রাণ দিতে প্রস্তুত, কিন্তু এই ধরনের যুবকেরাই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছেন এবং এই বিশ্বাসঘাতকতা থামানোই তো আমাদের কর্তব্য।
ফকীরবাবা! এই কারণেই ভালোভাবে চিন্তা করে সভা এই শিবমন্দিরেই আয়োজিত করা হয়েছে। ভারতের সব প্রদেশ থেকে সমমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা এখানে জমায়েত হতে শুরু করেছেন এবং আসবেন। তারা সবাই ‘বারকরী’ অর্থাৎ বিঠঠল ভক্তদের মারাঠী বেশেই এখানে আসছেন এবং আসবেন।
আমাদের এই শিবমন্দির থেকে একটি সুরঙ্গ পথ গ্রামের পশ্চিম সীমানার বাইরে থাকা বিঠঠল মন্দিরে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানেও এমনই গুপ্ত ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। আমাদের এস্টেট ম্যানেজার গোবিন্দদাজীই সেই বিঠঠল মন্দিরের ভক্তদের প্রধান ভজনীবুয়া (কীর্তনকারী)। আপনাকে প্রতিটি প্রতিনিধির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজ গোবিন্দদাজী ও জানকী করবেন। তারপর আপনি মন খুলে সব বলুন, দেশজুড়ে ঘুরে যা দেখেছেন, গুপ্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সব বলুন।”
সুরঙ্গের পথ ধরে তারা তিনজনই বিঠঠল মন্দিরে গিয়ে পৌঁছালেন। সেখানে নামসপ্তাহের (সাত দিনের ভজন) প্রস্তুতি জোর কদমে চলছিল। যিনি সাধারণত শার্ট–প্যান্টের মতো আধুনিক পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতেন, সেই গোবিন্দদাজিই আজ সেখানে ধুতি–কুর্তা, গলায় বীণা ও তুলসীমালা, কপালে গরুচন ও আবীরের টিপ, আর হাতে করতাল— এমন রূপে সর্বত্র বিচরণ করছিলেন।
এক মুহূর্তের জন্য ফকীরবাবাও গোবিন্দদাজীকে চিনতে পারলেন না। আসলে গোবিন্দদাজী ও শিবরামরাজনেরই ছিল আসল বন্ধুত্ব। ফকীরবাবার মুখে কবীর পন্থের মতো নিরন্তর রাম নাম ছিল, আর গোবিন্দদাজীর মুখে বারকরী পন্থের মতো নিরন্তর বিঠঠল নাম ছিল।
সন্ধ্যার ভোজন শেষ হওয়ার পর গ্রামের প্রথা অনুযায়ী ভক্ত স্ত্রী-পুরুষ গোবিন্দদাজীর কীর্তনের জন্য সমবেত হতে শুরু করলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে 30% লোক ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল প্রাণ ছিলেন।
মূলত, এই অনেকের সঙ্গেই গোবিন্দদাজীর পরিচয় জানকীবাঈ-ই করিয়ে দিয়েছিলেন। এই ধরনের সাক্ষাতের ব্যবস্থা এই বিঠঠল মন্দিরে, এমনকি ভক্তদের ভিড় থাকা সত্ত্বেও হতো। সেখানে বিঠঠল মন্দিরের গর্ভগৃহের পাশেই সংস্কৃতের, বেদ পাঠশালার ক্লাসগুলি ছিল এবং প্রধানত নীরবতা ও ধ্যানের কক্ষও ছিল। এই কক্ষগুলিতেই সব গুপ্ত বৈঠক হয়েছিল।
গোবিন্দদাজী ‘জয় জয় রামকৃষ্ণ হরি’ এই সন্তশ্রেষ্ঠ জগৎগুরু তুকারাম মহারাজের দিব্য মন্ত্রধ্বনির মাধ্যমে আখ্যান শুরু করলেন। প্রজাদের উপর অত্যাচার করা রাবণের গল্প দিয়ে আখ্যান আরম্ভ হলো। রাবণ কীভাবে কুবেরের রাজ্য ছলনা করে জিতে নেয়, কিভাবে সেখানকার মূল বৈদিক ধর্ম দমন করল এবং সাধু-সন্তদের হত্যা করল, তার বর্ণনা চলছিল। কীর্তনের ‘শ্রীরঙ্গ’ অর্থাৎ গল্প শেষ হয়ে ‘উত্তররঙ্গ’ (পরবর্তী অংশ) শুরু হলো। প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের অবতারের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল।
শেষে ‘রাম লক্ষ্মণ জানকী, জয় বোলো হনুমান কী’ এই ধ্বনি জোরে জোরে শুরু হলো। কীর্তনে মগ্ন ভক্তরা, ধ্বনি ও করতালের আওয়াজ, মৃদঙ্গের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছিলেন না।
ভজনের জন্য ঠিক প্রবেশদ্বারের কাছে বসে থাকা একজন পৃষ্ঠদেশ বাঁকা বৃদ্ধ ব্যক্তি কাশতে-কাশতে লাঠির সাহায্যে আস্তে আস্তে করে বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং সেই অন্ধকারে সেই বৃদ্ধের সঙ্গে এক নারী এসে যোগ দিলেন।
সবসময়ের মতো কীর্তনের শেষে নিজেদের জাহির করতে আসা নিকটস্থ বড় গ্রামের একজন প্রতিষ্ঠান অধিকর্তা ব্যবসায়ী এবং তার ভারতীয় পুলিশ অফিসার ভাই নিজেদের ঘোড়ার গাড়ি থেকে মন্দির চত্বরে নামছিলেন।
নিচে নামল, এই দুজনের পেট ছিন্ন ভিন্ন হওয়া মৃতদেহ। সেই বৃদ্ধ ও সেই নারী আবার শান্তভাবে ভজন করছিলেন এবং সেই ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ান চিৎকার করে বলছিলেন, “ডাকাতি হয়েছে! আমার মালিকদের বাঁচান!” আর এই চিৎকার করতে করতে তিনি, ‘তারা দুজন নিশ্চিতভাবে মারা গেছেন’ তা নিশ্চিত করে নিলেন।
মন্দির থেকে জয়ধ্বনি হলো - ‘পণ্ডরীনাথ মহারাজ কী জয়’। এটা ছিল পরস্পরের প্রতি ইঙ্গিত।
(গল্প চলছে)
मराठी >> हिंदी >> English >> ગુજરાતી>> ಕನ್ನಡ>> తెలుగు>> தமிழ்>> മലയാളം>>
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
Comments
Post a Comment