মন্দিরের জয়ধ্বনি শেষ হতে না হতেই, অর্থাৎ ‘পণ্ডরীনাথ মহারাজ কী জয়’ এই শব্দগুলো মিলিয়ে যেতে না যেতেই, সেই গাড়োয়ানের চিৎকার মন্দিরের প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তির কানে স্পষ্টভাবে পৌঁছাল। মন্দিরের সামনে থাকা রাস্তার ঠিক অপর পাশেই ছিল রামচন্দ্র ধারপূরকরের এর পোল্ট্রি ও ডেয়ারি ফার্ম—যেখানে মুরগির পালন এবং গরু, মহিষ, ছাগল পালনসহ দুধের ব্যবসা চলত। সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা থাকা শ্রমিকরাও চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে স্বাভাবিকভাবেই দৌড়ে এসে সবার আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল।
মন্দিরের পুরুষেরা মহিলাদের ভিতরেই থাকতে বলে তড়িঘড়ি বাইরে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো। মৃত সেই দুজনের স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয় নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। অন্যান্য নারীরা তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই ধারপুর পুলিশ স্টেশনের পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবলরা সেখানে এসে পৌঁছাল। পুলিশের প্রচলিত নিয়মে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়ে গেল এবং সেই সঙ্গে কৌতূহলী দর্শকদের ভিড়ও ধীরে ধীরে নিজে থেকেই কমতে লাগল।
গাড়োয়ান ‘কীভাবে এবং কী ঘটেছে’ তা বিস্তারিতভাবে বলছিল। সে জানাল, গাড়ি থামতেই চার–পাঁচজন সবল ও লম্বা দেহের লোকের একটি দল হঠাৎ এগিয়ে আসে এবং দুই মালিককে তাদের কাছে থাকা সমস্ত সোনা ও টাকা দিয়ে দিতে বলে। কিন্তু দুই মালিকই বাধা দিতে গেলে ধস্তাধস্তি শুরু হয় এবং তারা চিৎকারও করতে থাকে। সম্ভবত এই কারণেই সেই দুষ্কৃতীরা দুজনকেই ছুরি মেরে তাঁদের শরীরে থাকা সব সোনা ও কাছে থাকা সমস্ত টাকা নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
বরিষ্ঠ পুলিশ অধিকারী গাড়োয়ানের গলা চেপে ধরে কঠোর স্বরে জিজ্ঞেস করল—
“xxx! তাহলে তুমি তখন কী করছিলে? “তোমারই বা আঘাত লাগল না কীভাবে? সত্যি কথা বলো—তুমি কোথাও তাদের সঙ্গী-সাথি নও তো ?”
সেই গাড়োয়ান কাকুতি মিনতি করে বলতে শুরু করল, “সাহেব! আমাকে মারবেন না। আমি আমার জায়গা থেকে নেমে নিচে আসার আগেই আমার দুজন মালিক রক্তে মাখামাখি হয়ে নিচে পড়েছিলেন এবং সেই লুটেরারা সোনা ও টাকা বের করে নিচ্ছিল। আমি তা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। তখনই সেই লুটেরাদের মধ্যে একজন আমাকে জোরে লাথি মারল এবং আমি দূরে ছিটকে পড়লাম। তারা এখান থেকে চলে যাওয়ার পরেই আমি কোনোমতে উঠলাম এবং ভয়ে ভয়ে গাড়ির কাছে এলাম, আমার কান্না চলে এলো। দেখুন! এখনও আমি কাঁপছি।”
সেই গ্রামেই বসবাসকারী অর্থাৎ ধারপূর-নিবাসী দুইজন পুলিশ সিপাহী বললেন, “সাহেব! এর শরীর দেখুন। একেবারে হাড্ডিসার, খুবই রোগা পাতলা আর দুর্বল। গোটা গ্রাম একে ‘ভিতরা সখ্যা’ (ভীতু সখা) নামেই চেনে। এ এক নম্বরের কাপুরুষ। এ কিসের জন্য না ভয় পায়? এ ইঁদুরকে ভয় পায়, এ কুকুরদের ভয় পায়, এ শিংওয়ালা গরু-মহিষ তো দূর, বড় পাঁঠাদেরও ভয় পায়। দূর থেকে সাপ দেখলেও এ চিৎকার করতে করতে দৌড়ায়। এ লুটেরাদের কী সাহায্য করবে!
তাছাড়া এর মা-বাবা কেউ নেই। এই অনাথ ছেলেটিকে, আমাদের এই স্বর্গগত পুলিশ অফিসার সাহেবই কাজে রেখেছিলেন এবং ও তাদের বাড়ির বারান্দায় থাকে। এর বাবাও ঘোড়াওয়ালা ছিলেন। তাই এ শুধু ঘোড়াকে ভয় পায় না।”
এই তথ্যের কারণে সিনিয়র পুলিশ অফিসার কিছুটা নরম হলেন, “কী রে সখ্যা! কবে থেকে সাহেবের কাছে কাজ করছিস? আর সেই লুটেরাদের মধ্যে কাউকে চিনতে পারলি কি?”
সখ্যা দুই হাত জোড় করে এবং হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “সাহেব! আমি সাহেবের শ্বশুরবাড়ির গ্রামে থাকতাম। ওনার শ্বশুরমশাইই আমাকে সুপারিশ করে ওনার কাছে পাঠিয়েছিলেন। গত তিন বছর ধরে আমি এদের ঘোড়াগাড়ি সামলাই এবং ঘোড়াদের যত্ন নিই।
সাহেব! একে তো অন্ধকার, তার উপর সেই লুটেরারা কম্বল দিয়ে মুখ আংশিকভাবে ঢেকে রেখেছিল। তাই ভালোভাবে দেখতে পারিনি। তবে কেউ পরিচিত মনে হয়নি। কিন্তু যে আমাকে লাথি মেরেছিল, সেই লুটেরার পায়ে বিশাল কড়া ছিল। এমন পায়ের মোটা কড়া আমি এর আগে কখনও দেখিনি।”
আরও অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হল, এবং পুলিশ অফিসারদের বিশ্বাস হল যে এটি নিশ্চয়ই অন্য প্রদেশ থেকে আসা দুষ্কৃতীদের একটি দলই করেছে। তাঁরা মৃতদেহের পূর্ণ বিবরণ নথিভুক্ত করলেন এবং উপস্থিত প্রৌঢ় ব্যক্তিদের বয়ান নিলেন। কেউই কিছুই জানত না। সকলে শুধু গাড়োয়ানের চিৎকারই শুনেছিল এবং মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে মৃতদেহ দু’টি দেখেছিল মাত্র।
সেই মৃত পুলিশ অফিসারের স্ত্রীও কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “এই সখ্যা আমার বাপের বাড়িতে ঘোড়াদেরই কাজ দেখত। সে খুবই স্নেহশীল ও বিশ্বাসী। সে সাহেবকে ঘাত করবে না।”
ধীরে ধীরে সমস্ত ভিড় সরে গেল। পুলিশ অফিসার ও সিপাহীরা চলে গেলেন। দুটি মৃতদেহ নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম শেষে আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হলো। মন্দিরের চত্বরে শুধু গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং মন্দিরে সবসময় আসা ভজন মণ্ডলীর লোকেরাই দাঁড়িয়েছিলেন।
মলহাররাও গ্রামের উপাধ্যায়কে প্রশ্ন করলেন, “আমাদের এই পবিত্র মন্দিরের আঙিনায় এমন রক্তপাত হয়েছে। আমরা বারকরীরা তো মাংসাহারও করি না। তাহলে এই স্থানটির এখন শুদ্ধিকরণ করতে হবে, তাই না?” এই প্রশ্ন আসলে সেখানকার প্রত্যেকের মনেই জেগেছিল।
উপাধ্যায় মিটমিটে আলোর নিচে পঞ্জিকা ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, “মলহাররাও! মুহূর্তও ভালো ছিল না এবং নক্ষত্র তো খুবই খারাপ ছিল। তাই শুদ্ধিকরণ ও শান্তি পাঠ তো করতেই হবে। এই আঙিনাতেই সব ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে চারদিক থেকে মণ্ডপ বাঁধতে হবে। ‘কারো অশুভ ছায়া যেন না পড়ে’ সেই জন্য মণ্ডপের চারপাশ মোটা তাঁবুর কাপড় দিয়ে ঘিরে দিতে হবে এবং এই মণ্ডপে শুধু গণ্যমান্যদেরই যাতায়াতের অনুমতি থাকতে হবে।” উপাধ্যায় মশাই প্রয়োজনীয় উপকরণের একটি লম্বা তালিকা তৈরি করে দিলেন।
উপাধ্যায় মশাই ও মলহাররাও মিলে গ্রামের কৌতূহলী স্বভাবের কয়েকজন লোককেই এ কাজের জন্য নিযুক্ত করলেন। স্বভাবতই তাঁদের মন্দিরের প্রাঙ্গণ থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।
সবাই চলে গিয়েছিল। রাত তখন দুটো বেজেছিল। মন্দিরের সভামণ্ডপে শুধু মলহাররাও, গোবিন্দদাজী, উপাধ্যায়, জানকীবাঈ এবং গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফড়কে মাস্টার এই কয়েকজনই শুধু ছিলেন। মন্দিরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে সবাই মন্দিরের পাতালঘর থেকে শিবমন্দিরের পাতালঘরে এসে পৌঁছালেন। সেখানে ফকীরবাবা অর্থাৎ শিবরামরাজন অপেক্ষা করে বসেছিলেন। প্রধান শিক্ষক ফড়কে মাস্টারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফকীরবাবা বললেন, “কেউই আপনাকে চিনতে পারল না। আপনি ভজনের জন্য যেখানে বসেছিলেন, ঠিক তার সামনে আমি বসেছিলাম। মাঝে মাঝে ভজন থেকে ওঠা এবং দুটি ভজনের মধ্যবর্তী সময়ে অথবা একটি জয়ধ্বনি শেষ হয়ে অন্যটি শুরু হওয়ার সময়ে অনেক লোক আপনার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল। এই স্কুলে গত দশ বছর ধরে থেকেও আপনাকে কেউ চিনতে পারল না। সত্যিই আপনি জাত অভিনেতা! আর কী দ্রুততায় সেই ব্যবসায়ীর পেটে ছুরি মারলেন আপনি! তুলনা নেই!”
ফড়কে মাস্টার দুই হাত জোড় করে ভগবানের স্মরণ করতে করতে বললেন, “এটা স্বয়ং ভগবানের কৃপাতেই হতে পারে। আমার কথা ছেড়ে দিন। ‘দুই ভাই এসেছে’ এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জানকীবাঈ যে ক্ষিপ্রতার সাথে গোপালকদের ছোট কম্বল গায়ে জড়িয়ে আমার সাথে যোগ দিল, সেটা ছিল আশ্চর্যের এবং সেই তো সেই নীচ পুলিশ অফিসারের উপরই কুড়ুলের ঘা মারল।”
মলহাররাও স্নেহের সাথে নিজের পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কন্যা ! তুই সত্যিই রণরাগিণী (যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনকারী)। এই দুই নীচ ভাইই আমাদের জেলার বহু দেশভক্তকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। সেই ব্যবসায়ী ভাই পুলিশকে গোপন খবর সরবরাহ করত এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ধরিয়ে দিত, আর সেই পুলিশ অফিসার ভাই তাদের সকলের উপর অকথ্য অত্যাচার করত, সেটাও সর্বসমক্ষে।
এর ফলে প্রচণ্ড ভীতি তৈরি হয়েছিল।”
ফকীরবাবা ‘প্রভু রামচন্দ্র কী জয়’ বলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বললেন, “এখানকার ভীতি দূর হয়েছে। কাজের শুরুটা জানকী করেছে। তাকে সাহায্য করেছেন মহাদেবরাও ফড়কে এবং পুরো পরিকল্পনা তৈরি করেছিল রামচন্দ্র। রাম, জানকী ও শিব একসাথে হলে অশুভের বিনাশ হবেই।”
(গল্প চলছে)
मराठी >> हिंदी >> English >> ગુજરાતી>> ಕನ್ನಡ>> తెలుగు>> தமிழ்>> മലയാളം>>
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
Comments
Post a Comment