“দেশভক্তদের জন্য মৃত্যুর মতোই নিষ্ঠুর” হিসেবেই হেলডেনের কুখ্যাতি ছিল। মুম্বাই-পুনের মতোই তাঁর অধীনে থাকা জেলে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের রাখা হতো। ‘তাঁর জেলখানা মানে পৃথিবীর ওপরে থাকা নরক’—এভাবেই সেই জায়গাকে তার জেলের হাওয়া খেয়ে আসা লোকেরা বর্ণনা করতেন। তিনি এসেই তড়িঘড়ি করে তদন্ত শুরু করলেন। তার কান ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আর মালহাররাও ফকীরবাবা ও ফড়কে মাস্টারের সাহায্যে বিঠঠল মন্দিরের গজর এবং তালের আওয়াজ দ্বিগুণ জোরদার করে চলছিল। সেই আওয়াজে বিরক্ত হয়ে ‘কী চলছে’ তা দেখতে হেলডেন সরাসরি সেই দিকে রওনা হলেন। তাঁর পেছনে মালহাররাও, ধনাজী পাটিল এই দু'জন এবং হেলডেনের চারজন বিশেষ বিশ্বস্ত ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তা রওনা হলেন।
রাস্তায় যেতে যেতে মালহাররাও সেই হত্যা এবং সেই জায়গা সম্পর্কে হেলডেন সাহেবকে ভালোভাবে বলে দিলেন। এর ফলে হেলডেন সাহেবের মনের সন্দেহ আরও বাড়বে—এই বিষয়ে মালহাররাওয়ের সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল।
এর পাশাপাশি, এই ব্রিটিশ অফিসার জোর করে মন্দিরের ভেতরে ঢুকবেন না; কিন্তু তাঁর সেই চার ভারতীয় কুকুরের মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত পুলিশ অফিসার্স পুরো জায়গাটা একেবারে তন্নতন্ন করে খুঁজবেন—এই বিষয়েও মালহাররাওয়ের সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল।
এই চারজন পুলিশ অফিসার্সই এলাকায় খুব কুখ্যাত ছিলেন। তার মধ্যে, গ্রামে খুন হওয়া পুলিশ অফিসার ছিলেন হেলডেনের পঞ্চম কুকুর এবং এর ফলে তারা চারজনই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।
গুপ্ত দরজা, গুপ্ত ঘর এবং পাতাল ঘর তাঁদের পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না। এর দুটি কারণ ছিল। এক, ফকীরবাবা অর্থাৎ শিবরামরাজন-ই নির্মাণশৈলী সেভাবে তৈরি করেছিলেন এবং দুটি মন্দিরের নির্মাণকাজে অংশ নেওয়া তামিল শ্রমিকরা অনেক আগেই তাঁদের নিজেদের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের জায়গা এবং গুপ্ত দরজার কাছে ভজনের জন্য মহিলাদেরই বসানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অনেক মহিলা এই চারজনের আত্মীয়, গ্রামের বা একই জাতের লোক ছিলেন এবং এমন মহিলাদের মধ্যে ঢুকে ব্যবস্থা নিলে এই চারজনই তাদের নিজেদের জাত এবং গ্রামের পক্ষ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারতেন।
সেই চারজন বাইরে এসে হেলডেনকে চাপা গলায় ইংরেজিতে বললেন যে, “বাকি সব ঠিকঠাক মনে হচ্ছে, কিন্তু তিনটি জিনিসে খটকা লাগছে। ১) মহিলারা একদিকে, পুরুষরা একদিকে এভাবে বসার প্রথা থাকা সত্ত্বেও, এখানকার মন্দিরে মহিলাদের দল পুরুষদের থেকে আলাদা হলেও সভামণ্ডপে জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ২) মন্দিরের সভামণ্ডপের বাইরের প্রাঙ্গণে একটি নতুন করে তৈরি করা মণ্ডপ আছে। যেখানে হত্যা হয়েছে, ঠিক সেই জায়গাতেই শুদ্ধিকরণের বড় হোম চলছে। হোমকুণ্ডটি খুব বড় আকারের তৈরি করা হয়েছে এবং সেখানেও বেশ ভিড় আছে। মূলত আঠারো-পাগড়ি জাতিদের মধ্যে থেকে (সেই সময়ের রীতিনীতির অনুযায়ী আঠারোটি প্রধান জাতি ছিল এবং প্রতিটি জাতির নিজস্ব যে পাগড়ি, সাফা বা ফেটা ছিল, তা শুধু তাদেরই জাতির লোকেরা পরতে পারত) প্রতিটি জাতের প্রধান নাগরিকরা আশেপাশের গ্রাম থেকেও আসছেন এবং তাঁদের সবাইকে আঘাত করা হলে খুব বড় অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। খটকা লাগার মতো বিষয় হলো, একটি জাতকেও মণ্ডপের বাইরে রাখা হয়নি। এমনকি গ্রামের বাইরে বসবাসকারী জাতের লোকেরাও এই মণ্ডপে স্থান পেয়েছে। এই লোকদের এত মান-সম্মান পাওয়ার কারণ কী? গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরা অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও ব্যবসায়ী শ্রেণী এর বিরোধিতা কেন করছে না? এর স্পষ্ট অর্থ হলো, কিছু একটা ষড়যন্ত্র চলছে। ৩) অনেক মুখ অচেনা মনে হচ্ছে। এই এলাকার লোক বলেই মনে হচ্ছে না। এমন সব সন্দেহভাজন এবং সব জাতিপ্রধানদের ধরে পুলিশ থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাব কি? হান্টারের চার-পাঁচ ঘা পড়লে কেউ না কেউ মুখ খুলবেই।”
হেলডেন তাঁর বাহিনী নিয়ে জেলার প্রধান স্থানে চলে গেলেন। তাঁদের মধ্যে কেউই জানতেন না যে মালহাররাও, ফকীরবাবা এবং ফড়কে মাস্টার ইংরেজি চমৎকার বুঝতে পারতেন এবং বলতেও পারতেন। তাঁরা শুধু জানকীবাঈকে তাঁদের থেকে দূরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন এবং সেটাও তাঁর মান বজায় রেখেই, কারণ তাঁর স্বামী অর্থাৎ রামচন্দ্র ধারপুরকরের ব্রিটিশ সরকারের ওপর থাকা প্রভাব হেলডেনের ভালো করেই জানা ছিল।
তাঁরা সবাই চলে যেতেই মালহাররাও প্রতিটি জাতি এবং গ্রামের তাঁদের প্রধান সহকারীদের নিয়ে খুব শান্তভাবে বিঠঠল মন্দিরের একটি গুপ্ত ঘরে গেলেন। হেলডেন ও তাঁর অফিসার্স-দের মধ্যে হওয়া সব কথোপকথন মালহাররাও সবাইকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেন।
কেউ কেউ নম্রভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘রানির ঘোষণাপত্র’ মানে ঠিক কী? জালিয়ানওয়ালা বাগ কোথায় এবং সেখানে কী ঘটেছিল? “দান্ডী যাত্রায় সব কিছু শান্তিপূর্ণভাবে চলতে থাকা সত্ত্বেও মানুষের মাথা ফাটল কী করে?”
মালহাররাও শান্তভাবে চোখ বন্ধ করে স্বয়ম্ভগবানের মন্ত্রগজর করলেন এবং এক-একটি করে বিষয় বলতে শুরু করলেন।
(গল্প চলছে)
मराठी >> हिंदी >> English >> ગુજરાતી>> ಕನ್ನಡ>> తెలుగు>> தமிழ்>> മലയാളം>>

.jpg)

.jpg)
Comments
Post a Comment